
‘দাদা, দাদা, এই বইটা কিনে দাও। আজকে আমি সুপারম্যান শিখব। এইটা কিনে দাও। দাদা, এই ছবিটায় রং করব’—আজ শুক্রবার সকালে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছোটদের একটি বইয়ের স্টলে কয়েকটি বই হাতে নিয়ে এমনই বায়না ধরে ছয় বছরের অরিত্র। বায়নায় যেমন জেদ, তেমনি চোখেমুখে উচ্ছ্বাস।
পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন অরিত্রর দাদা অমল হাওলাদার। মৃদু হেসে তিনি বললেন, ‘আমার নাতি এবারই স্কুলে ভর্তি হয়েছে। প্রথমবার বইমেলায় এনেছি। বায়নার শেষ নেই।’
অনিশ্চয়তার দোলাচল কাটিয়ে মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ প্রান্তে এসে গতকাল বৃহস্পতিবার অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পবিত্র রমজান মাসের কারণে এ বছর মেলার সময়সূচিতে এসেছে পরিবর্তন। প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত মেলা চলবে। শুক্র, শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে থাকবে শিশুপ্রহর। এদিন মেলার দ্বার খুলবে বেলা ১১টায়। শিশুপ্রহর থাকবে বেলা ১টা পর্যন্ত। এর পর থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে সবার জন্য। রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গ্রন্থানুরাগীরা মেলায় প্রবেশ করতে পারবেন। আজ শুক্রবার মেলার প্রথম শিশুপ্রহর।
আজ রোদের তেজ আর রোজার আমেজ মিলিয়েও ছোটদের উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি। রঙিন মলাট, ছবি আঁকার খাতা, ছড়ার বই আর পুতুলনাচ—সব মিলিয়ে প্রথম শিশুপ্রহরে প্রাণ ফিরে পেয়েছে অমর একুশে বইমেলা।
পুতুলের ডাকে ছোটদের ভিড়
শিশুপ্রহরের মূল আকর্ষণ ছিল পাপেট শো। তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জাহরিয়া মায়ের হাত ধরে একের পর এক স্টল ঘুরছিল। কার্টুন আঁকা বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে হঠাৎ থেমে যায় পুতুলনাচের মঞ্চের সামনে এসে। বারবার উঁকি—কখন শুরু হবে অনুষ্ঠান?
একসময় মঞ্চের পেছন থেকে ভেসে আসে ডাক, ‘বন্ধুরা, তোমরা সবাই কেমন আছো? আমরা রেডি, তোমরা চলে এসো।’ মুহূর্তেই জাহরিয়াসহ শিশুরা দৌড়ে সামনে গিয়ে বসে পড়ে। পাটি বিছানো মেঝেতে সারি সারি মুখ, পেছনে দাঁড়িয়ে অভিভাবকেরা।
মঞ্চে হাজির হয় দুই পুতুল বন্ধু অপু ও দিপু। গল্পের ফাঁকে তারা দেয় নানা শিক্ষণীয় বার্তা। অপু–দিপু বিদায় নিতেই বেজে ওঠে পরিচিত সুর—‘বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে…’। গানের তালে তালে লেজ নাড়তে নাড়তে মঞ্চে আসে বিশাল এক বাঘ পুতুল। সামনে বসা শিশুরা একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে আনন্দে।
নাচতে নাচতে বাঘ নেমে আসে শিশুদের মাঝে। বাঘকে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় তারা। হাসি, হাততালি আর উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ।
বাবার কোলে বসা ছোট্ট তাসনিম পাপেট শো দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাততালি দিচ্ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বাবার কাছে তার সরল প্রশ্ন, ‘বাঘটা আবার আসবে?’ বাবা হেসে বলেন, ‘আবার আসবে, আমরা আবার দেখব।’
শিশু প্রহর ঘিরে মেলার ভেতরে তৈরি হয়েছিল আলাদা এক আবহ। মূল মঞ্চের আনুষ্ঠানিকতার বাইরে ছোট ছোট স্টলে রঙিন বই, আঁকার খাতা, ছড়া ও গল্পের সমাহার—সব মিলিয়ে যেন রঙিন শৈশবের এক উৎসব।
পাপেট শোর আয়োজকেরা বলেন, প্রতিটি শিশুপ্রহরে ভিন্ন গল্প নিয়ে হাজির হবেন তাঁরা। গল্পের ফাঁকে থাকবে গান, ছড়া ও অংশগ্রহণমূলক প্রশ্নোত্তর।
কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা আসাদুজ্জামান আশিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুরা গল্প খুব সহজে গ্রহণ করে। আমরা পাপেট শোর মাধ্যমে তাদের আনন্দ দিই। সেই আনন্দের ভেতরেই বার্তা রাখি। এই মাধ্যম দিয়ে সমাজের কুসংস্কার দূর করার চেষ্টা করি।’