ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা
ওয়াজ মাহফিল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আমির হামজা

প্রথম আলো ফ্যাক্ট চেক

তেল নিয়ে ‘সার্কাজমে’ সংসদ সদস্য আমির হামজাও বিভ্রান্ত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে দেশের জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে নানা আলোচনা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তার মধ্যে নানা ভুয়া, ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যও আসছে। সেগুলো আবার সত্য ধরে নিয়ে প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছেন অনেকে। এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা একটি বক্তব্য দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে নিয়ে, অথচ মন্ত্রী ওই কথা বলেনইনি।

কুষ্টিয়া–৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য আমির হামজা সম্প্রতি একটি ওয়াজ মাহফিলে তেলসংকট নিয়ে মন্ত্রীর কথিত মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানান।

আমির হামজা বলেন, ‘কত মন্ত্রী আজ কথা বলছে, তেল দিতে পারে না একটু সরি বলবে, না? বলছে হেঁটে চলাফেরা করতে পারেন না? শরীর ভালো থাকবে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পিটানো দরকার শয়তানকে, কালকের দিন পরে তো দেখা হবে। কারণ, আমার পাশে সিট, ওই সামনে তাকালে দেখা হবে, আমি জিজ্ঞাসা করব চোখে চোখে, আপনি একটা কথা বললেন, তেল দিতে পারেন না সরি বলবেন, না। ও বলছে হাটাহাঁটি করলে শরীল ভালো থাকে, সংসদের মেইন গেট থেকে ভেতর পর্যন্ত এতটুকু পথ উনি হেঁটে আসে না, গেটে নামে; এরপর মানুষের ঘাড়ে হাত দিয়ে যায় ভেতরে। আর সে যদি এই কথা বলে, কথা হিসাব–নিকাশ করে বলা দরকার না?’

ইউটিউব চ্যানেলে ওয়াজ মাহফিলে দেওয়া ১ ঘণ্টা ১৬ মিনিটের বক্তব্যে এই কথা রয়েছে ১ ঘণ্টা ১২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড থেকে ১ ঘণ্টা ১৩ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের মধ্যে।

লিংক: এখানে

যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, ‘একটা মাস গাড়ি ছাড়া চলুন, হাঁটাহাঁটি করলে শরীর ভালো থাকে’—মন্ত্রী রবিউল আলমের বক্তব্য দাবি করে ২৩ মার্চ ‘চ্যানেল এআই’ নামের একটি স্যাটায়ার ফেসবুক পেজ থেকে প্রথম একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। ‘চ্যানেল আই’-এর লোগোর আদলে তৈরি এই পেজের এই ফটোকার্ডই পরে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করেও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য বা সংবাদ পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে রিউমার স্ক্যানার ও দ্য ডিসেন্ট ফ্যাক্ট চেক করে নিশ্চিত করে যে শেখ রবিউল আলমের নামে প্রচারিত এই মন্তব্য সম্পূর্ণ মিথ্যা। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট ‘চ্যানেল এআই’ সার্কাজম পেজ থেকেও ফটোকার্ডটি সরিয়ে ফেলা হয়।

কিন্তু এই ভুয়া মন্তব্যকে সত্য ধরে নিয়েই সংসদ সদস্য আমির হামজা ওয়াজ মাহফিলে মন্ত্রীর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

মির্জা ফখরুলের নামে ভুয়া মন্তব্য

একই বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামেও একটি ভুয়া মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, তিনি বলেছেন, ‘জ্বালানি মন্ত্রীর নিজস্ব সিন্ডিকেট সারা দেশে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে।’

যাচাই করে দেখা যায়, তিনি এমন কোনো মন্তব্য করেননি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘আশার আলো’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে এই দাবি তৈরি করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে তথ্য পাওয়া যায়নি।

শামা ওবায়েদও অপতথ্যের শিকার

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের নামেও একটি ভুয়া মন্তব্যও ছড়িয়েছে ফেসবুকে। সেখানে দাবি করা হয়—তিনি বলেছেন, ‘ইন্ডিয়ার সঙ্গে আমাদের চোখ নিচু করেই কথা বলতে হবে, এই যে যেমন এখন ইন্ডিয়ার হাতে–পায়ে ধরে তেল আনতে হচ্ছে, গাধার মতো ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দিলেই তো হবে না, বুঝতে হবে যে ইন্ডিয়ার সঙ্গে ঝামেলা করলে আমাদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে।’

তবে যাচাইয়ে দেখা যায়, এই মন্তব্য প্রথমে ‘ব্যঙ্গবাজার’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে প্রকাশ করা হয়। পেজটির পরিচিতিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘ব্যঙ্গ যারা বুঝে তাদের জন্য।’ পেজটি পর্যালোচনা করে জানা যায়, এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নিয়মিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নিয়ে কাল্পনিক মন্তব্য প্রকাশ করা হয়।

২৫ মার্চ পেজটিতে এই পোস্ট প্রকাশের পর সেটিকেই সত্য ধরে নিয়ে অনেকে প্রতিক্রিয়া জানান; কিন্তু কোনো সংবাদমাধ্যমে তাঁর এমন কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সম্পাদিত ফটোকার্ডে বিভ্রান্তিকর দাবি

‘ধানের গোডাউনে মিলল ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল, বিএনপি নেতার গোডাউনে’—এমন শিরোনামে মোহনা টিভির নামে একটি ফটোকার্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়।

যাচাই করে দেখা যায়, মোহনা টিভির আসল ফেসবুক পেজে ২৮ মার্চ ‘ধানের গোডাউনে মিলল ৭০০ লিটার জ্বালানি তেল’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশিত হয়েছিল। তবে সেখানে ‘বিএনপি নেতার গোডাউনে’ অংশটি ছিল না। সম্পাদনা করে এই অংশটি যুক্ত করে প্রচার করায় বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।