নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট সমাধান, রেজিস্ট্রার ভবনের অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি রোধে ভবন ঘেরাও কর্মসূচি শেষে ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। ২০ এপ্রিল, ২০২৬
নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট সমাধান, রেজিস্ট্রার ভবনের অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি রোধে ভবন ঘেরাও কর্মসূচি শেষে ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। ২০ এপ্রিল, ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আবাসনসংকট নিরসনে ডাকসুর প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও, শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর কর্মসূচি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকট সমাধান, রেজিস্ট্রার ভবনের অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি রোধে প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদের নেতারা। অন্যদিকে বৈধ সিটের দাবিতে মধুর ক্যানটিনের সামনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছেন আবাসনসংকটে পড়া নবীন শিক্ষার্থীরা।

সোমবার দুপুরে ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তাঁদের হাতে ‘সিট ছাড়া ক্লাস কেন, প্রশাসন জবাব দে’, ‘দ্রুততম সময়ে ২৫-২৬ সেশনের সিট নিশ্চিত করো’, ‘লাঞ্চের পর আসেন কালচার বন্ধ করো’, ‘ডাকসুর অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’সহ বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। বিক্ষোভ শেষে তারা একটি মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও উপাচার্যের কার্যালয়ে যান।

মিছিল শুরুর আগে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফরহাদ আগামী ২৫ এপ্রিলের মধ্যে নবীন শিক্ষার্থীদের আবাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার আলটিমেটাম দেন। অন্যথায় প্রথম বর্ষের সব ধরনের ক্লাস বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন তিনি।

এস এম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ক্লাস শুরুর আগেই সমস্যার সমাধান হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। উপাচার্য আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত সিট নীতিমালা প্রণয়ন বা বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। আজ রাত পোহালেই অনেক শিক্ষার্থী জানে না তারা কোথায় থাকবে। এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।’

ফরহাদ আরও বলেন, ‘২৫ এপ্রিলের মধ্যে সিট নীতিমালা চূড়ান্ত করতে হবে। যাদের সিট দেওয়া সম্ভব নয়, তাদের আবাসন ভাতা বা শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় প্রথম বর্ষের ক্লাস বন্ধ থাকবে।’ ফরহাদ অভিযোগ করেন, একটি রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন শিক্ষার্থীদের দুর্বলতাকে পুঁজি করে আবারও ‘গণরুম সংস্কৃতি’ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা

ভবন ঘেরাও কর্মসূচি শেষে ডাকসু ও হল সংসদের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় বসেন। বৈঠকে আবাসনসংকট, রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের অব্যবস্থাপনা, কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা এবং সিট বরাদ্দে রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।

এ সময় সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা, প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমদ, প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ-আল-মামুন এবং অমর একুশে হলের প্রাধ্যক্ষ মুহাম্মদ জসীমউদ্দীনসহ অন্য শিক্ষকেরা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ আবদুল্লাহ-আল-মামুন জানান, ২০ এপ্রিলের মধ্যে নবীন শিক্ষার্থীদের সিট দেওয়ার বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। সিট বণ্টনের প্রক্রিয়াটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।

আবাসনসংকট সমাধান, রেজিস্ট্রার ভবনের অব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি রোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে সকালে মধুর ক্যানটিনের সামনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। ২০ এপ্রিল, ২০২৬

শিক্ষার্থীদের দাবি শুনে উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এখানে এসেছি আজকে এক মাস আট দিন। আমি এসে তোমাদের কথাগুলো শুনেছি। আমরা তোমাদের দাবির সাথে একমত এবং আন্তরিক। সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য আমরাও আপসহীন। এর জন্য আমরা অনেকবার মিটিংও করেছি।’

তবে বিশ্ববিদ্যালয় শতভাগ আবাসিক নয় উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে শতভাগ আবাসন–সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়। সেই জায়গা থেকে সিট নিশ্চিত করার পর ক্লাস শুরু করা আমাদের পক্ষে কঠিন।’

নবীন শিক্ষার্থীদের গণস্বাক্ষর কর্মসূচি

একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে সকাল আটটায় মধুর ক্যানটিনের সামনে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে নবীনদের পাশাপাশি বিভিন্ন বর্ষের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

কর্মসূচিতে ২০২৫-২৬ সেশনের শিক্ষার্থী শিব্বির আহমেদ বলেন, ‘আবাসনসংকট বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের সমস্যা। হলগুলোয় পর্যাপ্ত সিট নেই, আর অনেক শিক্ষার্থী ন্যায্যভাবে সিট পাচ্ছে না। দুঃখজনকভাবে ডাকসুর এ বিষয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকা নেই। তাদের এই অনীহা দেখেই আমরা শিক্ষার্থীরা গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরছি।’

আশ শামস নামের আরেক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত ১২ তারিখ থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হলেও আবাসন সমস্যার কারণে অনেক সহপাঠী এখনো নিয়মিত ক্লাসে আসতে পারছে না। আবাসন সমস্যা নিরসনে ডাকসু তাদের ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

ডাকসুর প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও কর্মসূচিকে ‘অপরাজনীতি’ আখ্যা দিয়ে এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘তারা আমাদের কর্মসূচির সমান্তরালে ঘেরাও কর্মসূচি দিয়েছে, যা অপরাজনীতি ছাড়া কিছু নয়। আমাদের প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত এই সংকট নিরসন করবে এবং পরবর্তী কোনো ব্যাচ যাতে এই সমস্যায় না পড়ে তা নিশ্চিত করবে।’

আবাসন ভাতার দাবি সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের

এদিকে শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করতে নতুন হল নির্মাণ এবং সাময়িক সমাধান হিসেবে ‘আবাসন বৃত্তি’ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে সংগঠনের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ও সাধারণ সম্পাদক আকাশ আলী বলেন, ক্লাস শুরুর সঙ্গে সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীরা কোথায় থাকবে, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। ঢাকার ব্যয়বহুল পরিবেশে বাইরে থাকা অনেকের জন্যই কষ্টসাধ্য। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে হলগুলোতে সিট বরাদ্দের যথাযথ প্রস্তুতি ছিল না।

বিবৃতিতে নেতারা আরও বলেন, বিগত সময়ে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে সিট বণ্টন হতো না। সেই সুযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের শিক্ষার্থীদের ‘গণরুমের’ নিকৃষ্ট পরিবেশে থাকতে বাধ্য করত। গণ-অভ্যুথান–পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীই আর সেই অপসংস্কৃতির পুনরুত্থান দেখতে চান না। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ডাকসুর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।