‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শিরোনামের একটি পর্বে বক্তব্য দিচ্ছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আজ রোববার দুপুরে
‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শিরোনামের একটি পর্বে বক্তব্য দিচ্ছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আজ রোববার দুপুরে

স্বৈরাচার উৎখাতে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় ততটাই খারাপ: মাহফুজ আনাম

স্বৈরাচার উৎখাতের সক্ষমতা বাংলাদেশের মানুষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য বলে মন্তব্য করেছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেছেন, ‘স্বৈরাচারকে উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায় ঈর্ষণীয় সক্ষমতা আছে। তবে স্বৈরাচার উৎখাত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা ভালো, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা ততটাই খারাপ। স্বৈরাচারকে উৎখাত করার পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারার প্রায় অফুরন্ত সক্ষমতাও আমাদের রয়েছে। এর মূল কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ।’

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) আয়োজনে তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিন আজ রোববার। এদিন দুপুরে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শিরোনামের একটি পর্বে বক্তা ছিলেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম।

বক্তব্যের শুরুতে বৈশ্বিক পর্যায়ে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। এখন বিশ্বে যত যুদ্ধ চলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একই সময়ে এত যুদ্ধ আগে কখনো দেখা যায়নি বলেন তিনি। কোনো শক্তিশালী দেশ চাইলেই অন্য কোনো দেশে গিয়ে বোমা ফেলছে—এই বাস্তবতায় ছোট দেশগুলোর নাজুক অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যখন গোটা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য আরও বেশি সম্পদ ব্যয় করা প্রয়োজন, এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলায় আরও বেশি সম্পদ দরকার, সমুদ্রের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা মোকাবিলায় আরও বেশি সম্পদ প্রয়োজন, সেই সময়ে বিশ্ব সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে অস্ত্রশস্ত্রের পেছনে। সার্বভৌমত্বের ধারণাটি এখন অস্ত্রের মজুত ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে। এটি আত্মঘাতী।

নৃশংস সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও এ দেশে একটি কার্যকর গণতন্ত্র গড়ে তোলা যায়নি বলে মন্তব্য করেন মাহফুজ আনাম। সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতা গ্রহণ ও পরে তার পতনের মধ্য দিয়ে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে ফেরার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমরা সত্যিই আশা করেছিলাম, এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন আমরা একাধিক নির্বাচনও করেছি। কিন্তু নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পরিবর্তে আমরা ক্রমেই সংঘাত ও ধ্বংসের দিকে এগিয়েছি। আমি মনে করি, আমরা ব্যর্থ হওয়ার কারণ হলো আমরা সত্যিই জানি না কীভাবে একটি দেশ পরিচালনা করতে হয়, আমরা আসলে জানি না শাসনব্যবস্থা কী। আমরা জানি না, কীভাবে মানুষের সব শক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সহনশীলতাকে একত্র করে সেই সম্পদকে জাতীয় উন্নয়নে রূপান্তর করতে হয়।’

‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর দ্বিতীয় দিনে ‘আমরা কি জানি কীভাবে শাসন পরিচালনা করতে হয়?’ শিরোনামের একটি পর্বে বক্তব্য দিচ্ছেন দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম। আজ রোববার দুপুরে

এর কারণ তুলে ধরতে গিয়ে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘স্বৈরাচার উৎখাতের সময় জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ে। যে গোষ্ঠীগুলো স্বৈরাচার উৎখাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছিল, তারাই পরে একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়। এখানেই বাংলাদেশে গণতন্ত্রের কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আমরা বারবার, বারবার এবং বারবার ব্যর্থ হয়েছি।’

মূল কারণ অতিরিক্ত রাজনীতিকরণ

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত রাজনীতিকরণকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন মাহফুজ আনাম। বক্তব্যে বলেন, ‘কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক, তার ভিত্তিতে দেশের চিকিৎসকেরাও বিভক্ত। আরও অনেক পেশার মানুষ এভাবে বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এর বাইরে নয়। আমাদের এখানে কেউ বিএনপিপন্থী সাংবাদিক, কেউ আওয়ামী লীগপন্থী, আবার কেউ জামায়াতপন্থী সাংবাদিক। কিন্তু একজন সাংবাদিক কীভাবে একই সঙ্গে কোনো দলপন্থী হতে পারেন? আপনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ থাকতেই পারে। আপনি অবশ্যই ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীন। কিন্তু যে পেশায় বিশ্বাসযোগ্যতাই আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, সেখানে আপনি কীভাবে প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেবেন এবং একই সঙ্গে আশা করবেন যে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন থাকবে?’

আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি সাংবিধানিক বা স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনীতিকরণ বা রাজনৈতিক ব্যবহারের বাস্তবতাও তুলে ধরেন এই সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দল যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হয়, তখন আমরা জনগণের ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে সেটিকে উদ্‌যাপন করি। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই, নির্বাচনের ফলাফল, অর্থাৎ জনগণের ইচ্ছা জনস্বার্থে রূপান্তরিত হওয়ার বদলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ নেয়।...পুরো সরকারব্যবস্থাকে নিজের দলের একটি সম্প্রসারণে পরিণত করা—এখান থেকেই পতনের শুরু। এর ফলাফল হয় দুর্নীতি, দলীয় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও আনুকূল্য। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর আমাদের পুরো শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।’

প্রযুক্তি একটি দক্ষ আমলাতন্ত্র এবং দক্ষ ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘প্রযুক্তি আমাদের খুবই কার্যকর আমলতন্ত্র ও পুলিশ দিতে পারে। সেখানেই বাংলাদেশ এখন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমরা যদি অগ্রগতি অর্জন করতে চাই, তাহলে এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যা পরিচালনা করা সহজ নয়। এ দেশের ভূমির পরিমাণ কম, কিন্তু জনসংখ্যা বিপুল। এ ছাড়া প্রাকৃতিক নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে, যদি দেশের মানবসম্পদকে মূল্যবান ও উৎপাদনশীল সম্পদে রূপান্তর করা যায়। এটি সম্ভব প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সুশাসনের মাধ্যমে।’