নির্মাণ করা হয়েছে খাবারের অস্থায়ী দোকান। গতকাল শুক্রবার, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে
নির্মাণ করা হয়েছে খাবারের অস্থায়ী দোকান। গতকাল শুক্রবার, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে

বাহাদুর শাহ পার্ক

বৃক্ষমেলার অনুমতি নিয়ে পার্কে শাড়ি–গয়না–কাবাবের দোকান

পার্কের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে লাল, নীল ও সাদা ত্রিপলের ছাউনি। বড় বড় গাছের গায়ে ও পাশে বাঁশ বেঁধে তৈরি করা হয়েছে সারি সারি দোকান। কোথাও ঝুলছে রঙিন হাতপাখা, কোথাও থালাবাসন। একটু সামনে শিশুদের খেলনার পসরা। পাশেই কৃত্রিম ফুল, নারীদের গয়না, চুড়ি আর ঘর সাজানোর সামগ্রী।

আরেকটু এগোতেই খাবারের আয়োজন। কাবাব, মমো, পানিপুরি, আইসগোলা, লাইভ রোলার আইসক্রিম, ডাবের পুডিং। বড় দোকানে সাজানো মিষ্টি, মুরালি, সন্দেশ ও জিলাপি। আছে জামাকাপড় ও শাড়ির দোকান। দুটি বক্সিং যন্ত্র ঘিরে কিশোর-তরুণদের ভিড়। এক পাশে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরের পর পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেল। চারপাশের দোকানপাট, বাঁশ আর ত্রিপলের ভিড়ে নতুন কেউ ঢুকলে এটি পার্ক, নাকি কোনো বাণিজ্যিক মেলা, প্রথম দেখায় বোঝাই কঠিন। অথচ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই জায়গায় অনুমতি দিয়েছে ‘বৃক্ষমেলা’ করার জন্য।

অস্থায়ীভাবে নির্মিত দোকানে বিক্রি হচ্ছে হরেক পদের মিষ্টি। গতকাল শুক্রবার, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে

ডিএসসিসি সূত্র বলছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের ১০ দিনের জন্য ‘সবুজ আনন্দ মেলা ২০২৬’ আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমতির উদ্দেশ্য বৃক্ষমেলা হলেও সরেজমিনে বৃক্ষমেলা–সংশ্লিষ্ট একটিমাত্র দোকান দেখা গেছে। ৬ থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত পার্কে এই মেলা চলবে।

মেলার দেখভালের দায়িত্বে থাকা আজিমপুরের বাসিন্দা মো. রনি প্রথম আলোকে বলেন, পার্কের ভেতরে তাঁদের ৬০টি দোকান বসানোর অনুমতি নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৩টি দোকান বসেছে। তাঁর ভাষ্য, বাইরে দোকান বসালে ঝামেলা হয়, তাই পার্কের ভেতরে দোকানগুলো বসানো হয়েছে।

একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি দোকানের জন্য দৈনিক তিন হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। ৩৩টি দোকান থেকে দিনে আদায় হয় ৯৯ হাজার টাকা। ১০ দিন একই সংখ্যক দোকান থাকলে অঙ্কটি দাঁড়ায় ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। আর অনুমতি নেওয়া ৬০টি দোকানই বসলে ১০ দিনে ভাড়ার অঙ্ক দাঁড়াবে ১৮ লাখ টাকা।

বৃক্ষমেলা প্রাঙ্গণে বসেছে খেলনার দোকান। গতকাল শুক্রবার, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে

এই টাকা কারা নিচ্ছেন, কোন ভিত্তিতে দৈনিক তিন হাজার টাকা ভাড়া ঠিক হয়েছে এবং সরকারি পার্ক ব্যবহার করে দোকানভাড়া আদায়ের অর্থ কোথায় যাচ্ছে—এসব প্রশ্নও উঠেছে।

ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, বৃক্ষমেলা করার জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি করপোরেশনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও জানেন।

ছাত্রদল সূত্র বলছে, সংগঠনটির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক তামজিদ ইমাম ও সদস্য সাদমান সাম্য এ অনুমতি নিয়েছেন।

বৃক্ষমেলার নামে নানা ধরনের দোকান বসানোর বিষয়ে সাদমান সাম্য প্রথম আলোকে বলেন, যথাসময়ে সিটি করপোরেশনের অনুমতি না পাওয়ায় বৃক্ষ নিয়ে কাজ করেন, এমন সবাইকে আনা সম্ভব হয়নি। মানুষকে আকৃষ্ট করতে গাছের পাশাপাশি খাবার, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, মানুষের হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের জায়গায় দোকান বসানো হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বৃক্ষমেলা করার জন্য অনুমতি দিয়েছি। এর বাইরে কিছু করলে মেলার অনুমতি বাতিল করে সব তুলে দেওয়া হবে।’

‘পার্কটাও যদি বাজার হয়, হাঁটব কোথায়’

নিয়মিত বাহাদুর শাহ পার্কে হাঁটতে আসেন, এমন এক নারী তাসলিমা জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুরান ঢাকায় খোলা জায়গা এমনিতেই নেই। এই ছোট পার্কটুকু মানুষ হাঁটা, বসা ও একটু স্বস্তির জন্য ব্যবহার করে। এখন এখানেও যদি বাঁশ গেড়ে বাজার বসানো হয়, তাহলে মানুষ যাবে কোথায়? ১০ দিনের কথা বলে আজ একজনকে দিলে কাল আরেকজন চাইবে। পার্ক রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের, তারাই যদি দোকান বসানোর অনুমতি দেয়, তাহলে দখলদারকে ঠেকাবে কে?’

পার্কের বাইরের এক দোকানি বিষয়টি নিয়ে আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলেন, ‘কে ঠেকাইবে, কে বলবে, যে বলবে তারে তো দিবে মাইর। এই আওয়ামী লীগ, এই বিএনপি, সবই এক।’

বাহাদুর শাহ পার্ককে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে পার্কের জায়গা ইজারা দিয়ে খাবারের দোকান চালুর সুযোগ দিয়েছিল ডিএসসিসি। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলনে নামে। ঐতিহাসিক পার্ককে বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত করার প্রতিবাদে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচিও হয়েছিল।

ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই ইজারা আর বহাল রাখা হয়নি। পার্ক থেকে খাবারের দোকানও সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ধারণা করা হয়েছিল, অন্তত বাহাদুর শাহ পার্ককে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে মুক্ত রাখার শিক্ষা নিয়েছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় আবার সেই পার্কেই দোকানের সারি। শুধু নাম বদলেছে। আগেরটি ছিল খাবারের দোকান, এবার আয়োজনের নাম ‘বৃক্ষমেলা’।

ইতিহাসের ওপর বাজার

বাহাদুর শাহ পার্ক পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান। একসময় এটি আন্টাঘর নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই জায়গার সঙ্গে। ব্রিটিশ আমলে এর নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। পরে শেষ মোগল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহর নামে পার্কটির নামকরণ করা হয়।

চারপাশে ঘনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক এলাকা। পুরান ঢাকার এই অংশে খোলা জায়গা বলতে হাতে গোনা কয়েকটি স্থান। ফলে বাহাদুর শাহ পার্ক শুধু ইতিহাসের স্মারক নয়, এলাকার মানুষের দৈনন্দিন হাঁটা, বিশ্রাম ও নিশ্বাস নেওয়ার জায়গাও।

পার্কে ঢুকলে দেখা মিলছে সারি সারি খাবারের দোকান। গতকাল শুক্রবার, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক বাহাদুর শাহ পার্কে

ঢাকায় এমনিতেই মাঠ ও পার্কের তীব্র সংকট। বহু এলাকায় শিশু-কিশোরদের খেলার জায়গা নেই, বয়স্ক মানুষের হাঁটার জায়গা নেই। যে অল্প কিছু জায়গা টিকে আছে, সেগুলো রক্ষা করাই যেখানে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব, সেখানে সেই প্রতিষ্ঠানই যদি পার্ককে সাময়িক বাজারে পরিণত করার অনুমতি দেয়, তাহলে নগরের উন্মুক্ত স্থান রক্ষার প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ঢাকায় উন্মুক্ত জায়গার সংকট কতটা ভয়াবহ, তা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণাতেই উঠে এসেছে। দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টিতে এখনো কোনো খেলার মাঠ নেই। ঢাকা দক্ষিণেরই মাঠবিহীন ওয়ার্ড ৩১টি।

এর মধ্যেই গত জুলাইয়ে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, খেলার মাঠ ও ফুটপাত থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদে সরকার বদ্ধপরিকর। তিনি আরও বলেছেন, ঢাকার অধিকাংশ পার্ক ও মাঠ ইতিমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও উচ্ছেদ অভিযান চলবে। এই ঘোষণার সঙ্গে বাহাদুর শাহ পার্কের গতকালের দৃশ্য মেলানো কঠিন।

নগর–পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, পার্ক কোনো বাণিজ্যিক মেলার মাঠ নয়। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে প্রতিটি পার্ক ও মাঠ নাগরিকদের জন্য সংরক্ষণ করা দরকার। সাময়িক অনুমতির নামে দোকান বসানোর সংস্কৃতি চালু হলে তা পরে নিয়মে পরিণত হয়। পার্ক এবং খেলার মাঠ যাতে অন্য বাণিজ্যিক কোনো কাজে ব্যবহার না হয়, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আহ্বান জানান তিনি।