
‘বাচ্চাদের সঙ্গে ঈদ করলাম। ছবি তুললাম। আনুষ্ঠানিকভাবে এটাই আমার শেষ ঈদ। এরপর তো অবসর’, বললেন জুবলি বেগম। তিনি রাজধানীর আজিমপুরে ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঈদের রাতে কথা হয় জুবলি বেগমের সঙ্গে। সরকারের এই প্রতিষ্ঠানে ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে উপতত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যোগ দেন তিনি। ২০১৯ সালে এক বছরের জন্য ছোটমণি নিবাস ভবনেরই চারতলায় নিম্নবিত্ত কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে বদলি হন। তারপর আবার ছোটমণি নিবাসে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। ১ জুন তাঁর শেষ কর্মদিবস। তারপর অবসর। বললেন, ২০১৪ সাল থেকে তাঁর সময় কেটেছে বিভিন্ন বয়সী শিশুদের সঙ্গে। এই শিশুদের দেখভালই ছিল মূল দায়িত্ব।
পরিবারের সিদ্ধান্তে বাল্যবিবাহ হয়েছিল জুবলি বেগমের। পরে আর সংসার করা হয়নি। সরকারি চাকরিজীবনে অসংখ্য শিশুর মুখ থেকে খালামণি ডাক শুনেছেন। তারাই তাঁর আপনজন। জুবলি বেগম সাত ভাই–বোনের মধ্যে সবার বড়। বলেন, ‘১৯৬৭ সালে জন্ম, সে হিসাবে তো প্রায় বুড়োই হয়ে গেছি। একা জীবন কাটাতে গিয়ে কর্মক্ষেত্র থেকে শুরু করে সব জায়গায় কটু কথা শুনতে হয়েছে। সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য মেপে মেপে পথ চলতে হয়েছে।’
জুবলি বেগম বলেন, ‘সরকারের এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত প্রধান যিনি থাকেন, তাঁকে শিশুরা মা, বড় আম্মা এমন ডাকে। তবে আমি সব সময় চেয়েছি এই শিশুরা আইনি প্রক্রিয়ায় অভিভাবক হিসেবে কাউকে মা-বাবা ডাকার সুযোগ পাক। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ শিশুর অভিভাবকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। তাদের কেউ আমেরিকা আছে। কেউ দেশেই আছে। তারা ভালো আছে। এটাই আমার কর্মজীবনের সব থেকে বড় প্রাপ্তি।’
সমাজসেবা অধিদপ্তরের আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসে পিতৃ-মাতৃপরিচয়হীন শূন্য থেকে ৭ বছর বয়সী পরিত্যক্ত বা পাচার থেকে উদ্ধার করা শিশুদের লালন-পালন করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশালে একটি করে মোট ছয়টি ছোটমণি নিবাস রয়েছে। আসনসংখ্যা ১০০ করে ৬০০টি। আজিমপুরের নিবাসটিতে বর্তমানে ৩৪ শিশু রয়েছে। সবচেয়ে ছোট যে, তার বয়স তিন মাস। আর বড় যে, তার বয়স ৬ বছরের একটু বেশি।
তৃপ্তি যেমন আছে, তেমিন আক্ষেপও আছে জুবলি বেগমের। বললেন ছোট খাদিজার কথা। নিবাসে আসার পর একদম ছোট বয়সে চোখে টিউমার ও ক্যানসার হয়। চোখে অস্ত্রোপচার হয়। কেমোথেরাপি চলে। এখন খাদিজা সুস্থ। তবে কোনো পরিবার খাদিজার অভিভাবকত্ব নিতে রাজি হয়নি। খাদিজাকে এসওএস শিশুপল্লিতে পাঠাতে পারলে ভালো থাকত বলে মনে করেন জুবলি।
নিবাসের প্রতিবন্ধী দুই শিশুকে নিয়েও ভাবেন জুবলি। ছোটবেলায় তাদের প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি তেমন চোখে পড়েনি। আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে হতে পরিবার যখন অভিভাবকত্ব পেল, তখন প্রতিবন্ধকতার বিষয়গুলো বেশ স্পষ্ট। দুটি শিশুকে ওই পরিবারগুলো নিতে রাজি হয়নি।
২০২২ সালের জুলাইয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কোর্ট ভবন এলাকায় সড়ক পার হতে গিয়ে ট্রাকচাপায় মারা যান জাহাঙ্গীর আলম (৪২), তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রত্না বেগম (৩২) ও তাঁদের ৬ বছর বয়সী মেয়ে সানজিদা। তখন সড়কেই জন্ম হয়েছিল ফাতেমার। আদালতের নির্দেশে আজিমপুরে ছোটমণি নিবাসেই বড় হচ্ছে ফাতেমা। ফাতেমার ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা হয় জুবলি বেগমের।
জুবলি বেগমের গলায় আবার একটু খুশির আমেজ। বলেন, ওই যে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার পর কুকুরে কামড় দিয়েছিল বাচ্চাটাকে, ও একটি ভালো পরিবার পেয়েছে। রাজধানীর নামকরা একটি স্কুলে পড়ছে।
কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব নেওয়ার পর অনেক মা-বাবা আর জুবলি বেগম বা ছোটমণি নিবাসের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চান না। পরিচয় গোপন রাখার জন্যই এটা করেন। তবে অনেকেই যোগাযোগ রাখেন।
জুবলি বেগমের মুখে আবার হাসি। বললেন, আমেরিকা থেকে এক বাবা ফোন করেছিলেন। ছোটমণি নিবাস থেকে শিশুকে দত্তক নিয়েছেন তিনি। ফোন দিয়ে সেই শিশুকে জুবলি খালামণির সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। বাচ্চাগুলো ভালোভাবে বড় হচ্ছে, এটা দেখতে খুব ভালো লাগে বলে জানান জুবলি।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার স্টেশনপাড়ার মেয়ে জুবলি বেগম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর করেছেন। তারপর ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মেহেরপুর সদরে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।
ছোটমণি নিবাসেও শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ হয়েছে। দেড় বছর বয়সী আরিশা আর ৫ মাস বয়সী মেহেদি হাম ও হামের জটিলতায় মারা গেছে। বর্তমানে চারজন শিশু রাজধানীর দুটি হাসপাতালে ভর্তি। এদের মধ্যে তিনজনই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছে। এদের হাসপাতালে দেখভালের জন্য বিভিন্ন বস্তি থেকে লোক ভাড়া করতে হয়েছে বলে জানান জুবলি বেগম।
এমন পরিস্থিতিতে নিবাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিতে হচ্ছে জুবলি বেগমকে। বললেন, ‘এদের জন্য সরকারি দায়িত্ব শেষ হবে। তবে সাধারণ মানুষ হিসেবে এদের দেখতে হাসপাতালে যাব। খোঁজখবর নেব। ওরা সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরুক আর কাউকে যাতে হাসপাতালে যেতে না হয়।’
জুবলি বেগম জানালেন, হামে একসঙ্গে ১৪ শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তখনকার অবস্থা ছিল ভয়াবহ। কাউকে রক্ত দিতে হবে, আবার কারও জন্য ইনজেকশন লাগবে। হামে দুজন শিশু মারা যাওয়ার ভয়াবহ কষ্টও ছিল। মেট্রন কাম নার্স হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
ছোটমণি নিবাসে জনবলসংকট রয়েছে বলে জানালেন জুবলি। খণ্ডকালীন চিকিৎসক এবং কম্পাউন্ডার পদগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। নিবাসে একজন আয়া, কটেজ মাদার একজন, খালাম্মা একজন, একজন মেট্রন কাম নার্স আর দুজন শিক্ষক রয়েছেন। এই জনবলের মধ্যে একজন হজে গেছেন, একজন অসুস্থ। নিবাসে সরকারের পক্ষ থেকে শিশুদের জন্য সব খরচ মিলিয়ে মাথাপিছু বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা।
জুবলি বেগম বলেন, ছোট শিশুদের দুধ কিনতেই তো অনেক টাকা লাগে। তবে বিভিন্ন ব্যক্তির পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই শিশুদের সহায়তা করে। ঈদ বা যেকোনো উৎসবে নতুন জামা কিনে দেওয়া, খাবার দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে পাশে থাকে তারা।
আলাপে আবার ঈদের প্রসঙ্গে ফিরে এলেন জুবলি বেগম। জানালেন, নিজে ইচ্ছা করেই রমজানের ঈদ তিনি নিবাসের শিশুদের সঙ্গে কাটাতেন। অসুস্থ বাবা-মা কোরবানি ঈদে সবকিছু সামলাতে পারেন না বলে কোরবানির ঈদ বাড়িতে করতেন। তবে এবার আর বাড়ি যাননি।
অবসরে যাওয়ার পর নিত্যদিনের রুটিন বদলে যাবে। শিশুদের কিচিরমিচির, তাদের সঙ্গে চিৎকার করা বা আদর করা এগুলো আর থাকবে না। তাই কিছুটা চিন্তিত জুবলি বেগম। হাসতে হাসতে বললেন, ‘আমার চেয়ারটাতে অন্য কাউকে বসতে দেখলে শিশুরা হয়তো প্রথম দিকে আমাকে খুঁজবে। মন খারাপ করবে। তারপর মানিয়েও নেবে। তেমনি আমিও নতুন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ব।’