
মে মাসে দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। এ ছাড়া গত মাসে ৮৩ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাঁদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
আজ শুক্রবার মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মে মাসের প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও নিজস্ব মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৬৬টি গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ফরিদপুরে গুজব ছড়িয়ে এক যুবককে এবং গাজীপুরে চুরির অভিযোগে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। চুয়াডাঙ্গায় এক যুবককে নির্যাতনের পর গরম পানি ঢেলে হত্যার অভিযোগও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে সুন্দরবনে বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে এক জেলে এবং জামালপুরে মাদকবিরোধী অভিযানের সময় নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরএসএস। এ ছাড়া গত মাসে ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৫ জন নিহত এবং অন্তত ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) দুজন এবং একজন সাধারণ নারী রয়েছেন।
মানবাধিকার সংগঠনটির মতে, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এসব সহিংসতার প্রধান কারণ। এপ্রিলে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বেশি (৯৮টি) থাকলেও মে মাসে প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে অন্তত ৩০৫ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের প্রায় ৭০ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ বছরের নিচে। ধর্ষণের পর ছয়জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাঁদের চারজনই শিশু।
প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, গত মাসে ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যাঁদের ৪২ জনই শিশু।
মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরএসএস। সংগঠনটি জানায়, গত তিন মাসে হামের উপসর্গ ও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে সারা দেশে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক দিনে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় চার বাংলাদেশি নিহত এবং ২০ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। একই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে তিনজন স্থানীয় নাগরিক নিহত হন।
এ ছাড়া মে মাসে বিভিন্ন ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৯৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা–কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় অন্তত ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত এবং ৯ জন হুমকি পেয়েছেন। এক সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
খাগড়াছড়িতে পুরোনো মামলায় এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার এবং চট্টগ্রামে শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজনের অবরোধ নিয়ন্ত্রণে ছোড়া গুলিতে দুই সাংবাদিক আহত হওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে দায়ের করা পাঁচটি মামলায় ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতির স্বার্থে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে এইচআরএসএস।