
ধর্ষণের প্রমাণ হিসেবে দেশে ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ (টিএফটি) নিষিদ্ধ হয়েছে ২০১৮ সালে। নিষিদ্ধের ছয় বছর পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগকারী নারী ও শিশুর মেডিকেল পরীক্ষা হিসেবে টিএফটি চলছে। প্রচার ও সচেতনতার অভাবে অভিযোগকারীকে আইনি সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যে অনেক সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা করা হচ্ছে। টিএফটিকে অমানবিক, অনৈতিক, অবৈজ্ঞানিক ও অনির্ভরযোগ্য উল্লেখ করে এর প্রয়োগ বন্ধে তদারকি বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন গবেষক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা। আজ বুধবার সকালে ১২টি সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম দ্য সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন (সিএসও) আয়োজিত সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। এ আয়োজনে সহযোগিতা করে আইসিডিডিআরবির অ্যাডসার্চ প্রকল্প ও আইপাস বাংলাদেশ।
রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘লিঙ্গ পরিচয় (জেন্ডার) ভিত্তিক সহিংসতা বন্ধে এক হই সবাই’ শিরোনামের এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে বলা হয়, ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুকে টিএফটি করার মানে হলো তাঁদের আবারও সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়া। এটা ভুক্তভোগীর জন্য ভীতিকর ও মানসিক পীড়নমূলক পরীক্ষা। অনেক ভুক্তভোগী এই ভীতি থেকে ধর্ষণের অভিযোগ করতে চান না। এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে।
সম্মেলনে জানানো হয়, এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১০ মাসে সংবাদমাধ্যমে ৩৬৫ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ৯ নভেম্বর প্রথম আলোতে ‘রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলালেও নারী ও শিশু নির্যাতনের চিত্র আগের মতোই’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুসারে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ৯ মাসে সারা দেশের থানা ও আদালতে ধর্ষণের অভিযোগে ৪ হাজার ৩৩২টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে আরও ১ হাজার ৮৭০টি মামলা হয়েছে।
সম্মেলনে টিএফটি বিষয়ক পর্বটি সঞ্চালনা করেন আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের ইমেরিটাস বিজ্ঞানী রুচিরা তাবাসসুম নভেদ। তিনি বলেন, নারী অধিকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো গবেষণালব্ধ ফলাফল তুলে ধরে বহু বছরের চেষ্টায় ধর্ষণ প্রমাণে টিএফটি নিষিদ্ধ করাতে সক্ষম হয়। কিন্তু অনেক আইনজীবী ও চিকিৎসক বিষয়টি না জানার কারণে আইনি প্রক্রিয়ার জন্য ভুক্তভোগীর টিএফটি করেন। মামলা পরিচালনার জন্য এই পরীক্ষার যে প্রয়োজন নেই, তা না জানার কারণে এই অমানবিক পরীক্ষা বন্ধ হচ্ছে না। টিএফটি নিষিদ্ধের বিষয়ে প্রচার আরও বাড়াতে হবে।
সম্মেলনের একটি পর্বে টিএফটি বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমাজভিত্তিক ওষুধ ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের প্রভাষক ফাহমিদা নার্গিস জানান, বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে এই বিতর্কিত পরীক্ষাটি ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অকার্যকর। এই পরীক্ষার মাধ্যমে এমন ধারণা নেওয়া হয় যে দুই আঙুল প্রবেশ না করতে পারলে তা ধর্ষণ নয়, সহজে প্রবেশ করলে ওই নারী বা শিশু যৌন মেলামেশায় অভ্যস্ত, যৌনাঙ্গে আঘাত না থাকলে ধর্ষণ নয়। অথচ নারী ও শিশুর বয়স ও স্বাস্থ্য অনুযায়ী যৌনাঙ্গের আকৃতির ভিন্নতার কারণে টিএফটির মাধ্যমে ধর্ষণের প্রমাণ না–ও উঠে আসতে পারে। বিশেষ করে বিবাহিত নারী ও শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা আরও অকার্যকর। ধর্ষণের শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে দেরি করে পরীক্ষা করার কারণে ও আঘাতের স্থান দ্রুত পূর্বের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার কারণে ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গে আঘাত থাকে না।
নিষিদ্ধ টিএফটির প্রয়োগ নিয়ে গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের জেন্ডারসমতাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ নাহিদা আক্তার। তিনি জানান, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৬ হাজার ৬৯৫টি ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে, ধর্ষণের ঘটনায় মাত্র ৩ শতাংশ মামলার রায় হয়েছে। তিনি বলেন, ঢাকা, রংপুর ও দিনাজপুরের আটটি হাসপাতাল, আইনজীবী ও এনজিওকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় দেখা গেছে, ঢাকায় বেশির ভাগের টিএফটি নিষিদ্ধের বিষয়ে ধারণা থাকলেও বাকি দুটি জেলায় বেশির ভাগের ধারণা নেই। সেসব জায়গায় চিকিৎসকেরা টিএফটি পরীক্ষা করেন এবং আইনজীবীরাও আদালতে সেই পরীক্ষার প্রতিবেদন জমা দেন। আদালত থেকেও বলা হয় না যে টিএফটি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদা রেহানা বেগম টিএফটি নিষিদ্ধের বিষয়ে প্রচার আরও বাড়াতে সমন্বিতভাবে সরকারি–বেসরকারি উদ্যোগ নিতে বলেন।
সম্মেলনের আলোচনা পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেন, টিএফটির মতো নিষ্ঠুর একটি পরীক্ষা আদালত নিষিদ্ধ করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নির্দেশিকাও তৈরি করে বিতরণ করেছে। টিএফটি যেন না করা হয়, সে লক্ষ্যে সরকার প্রচার আরও বাড়াবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন হক বলেন, কমিশন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ করবে। টিএফটি নিষিদ্ধ হলেও তা যে বাস্তবায়িত হচ্ছে না, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেও সুপারিশ করবে কমিশন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে কানাডীয় হাইকমিশনের প্রথম সচিব (উন্নয়ন) এডওয়ার্ড ক্যাবরেরা। সম্মেলনে সহসভাপতি হিসেবে আইসিডিডিআরবির অ্যাডসার্চ প্রকল্পের পরিচালক শামস এল আরিফিনসহ আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী আহমেদ এহসানূর রহমান বক্তব্য দেন।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও সিএসও ফোরামের সহ–আহ্বায়ক সারা হোসেন বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম টিএফটি নিষিদ্ধ করে। সরকার–বেসরকারি সংগঠন এবং রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজ একসঙ্গে কাজ করার কারণে এই পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন যেন শুধু সুপারিশ প্রতিবেদন না দেয়, তারা যেন সংস্কারের কাজও করে। নাগরিক সমাজ থেকেও সুপারিশ আসতে হবে। তা না হলে সংস্কার কঠিন হয়ে যাবে।
পর্বটি সঞ্চালনা করেন নারীপক্ষের নির্বাহী সদস্য তাসনীম আজীম।
এ ছাড়া সম্মেলনে নারী অধিকার ও নারীর প্রতি সহিংসতার পরিণতি নিয়ে উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সৈয়দ রুবায়েত ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাওসার আফসানা।
সম্মেলনে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সভাপতি অধ্যাপক ফারহানা দেওয়ান। সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন আইপাস বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা ফারহানা জেসমিন হাসান।