আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

বন্দীদের দুজন চেপে ধরে রাখত, জিয়াউল গুলি করত: জবানবন্দিতে পাথরঘাটার জেলে

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণ চর দুয়ানীর বাসিন্দা মো. আব্বাস মল্লিক।

পেশায় জেলে আব্বাস মল্লিক বলেছেন, চর দুয়ানী দিয়ে বলেশ্বর নদে যেতেন এবং সেখান থেকে এক দেড় ঘণ্টা ট্রলার বা নৌকা চালিয়ে গভীরে যেতেন। নদের গভীরে যাওয়ার পর নৌকা বা ট্রলারের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বন্দীদের বের করে আনা হতো। ট্রলার/বোটের দুই পাশে সাপোর্ট নামক একটি অংশ থাকে। একজন বন্দীকে বের করার পর দুজন র‍্যাব সদস্য তাঁকে সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখতেন। এরপর জিয়াউল আহসান ওই বন্দীর মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করতেন। এরপর ওই মৃত বন্দীর গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে লাশ নদে ফেলে দেওয়া হতো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আজ বুধবার এই জবানবন্দি দেন সাক্ষী আব্বাস মল্লিক। এই মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান। তিনি গ্রেপ্তার আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, ২০১০ সালে র‍্যাব চর দুয়ানী ও কাঁঠালতলীতে আসা-যাওয়া করত। র‍্যাব সদস্যরা নৌকার মালিকদের ডেকে বলেন, নৌকা বা ট্রলার অভিযান পরিচালনার জন্য দিতে হবে। যেদিন তাঁদের এলাকায় র‌্যাবের অভিযান থাকত, সেদিন বিকেলে সাদাপোশাকে দুজন র‍্যাব সদস্য তাঁদের এলাকায় আসতেন। দোকানের মালিকদের ডেকে বলতেন সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ থাকবে এবং দোকানের বাতি নিভিয়ে রাখতে হবে। রাত ১১টা থেকে ১২টার দিকে র‍্যাবের ৪ থেকে ৫টি মাইক্রো আসত। গাড়িগুলো বরফ মিলের সামনে থামত। এরপর গাড়ি থেকে বন্দীদের নৌকায় নিয়ে তুলতেন।

বন্দীদের ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হতো উল্লেখ করে জবানবন্দিতে আব্বাস মল্লিক বলেন, বন্দীদের হাত ও চোখ বাঁধা থাকত। বন্দীদের নৌকায় ওঠানোর পর রিয়াজের দোকান থেকে সিমেন্টের বস্তা, রশি ও হোগলা নেওয়া হতো তাঁদের সঙ্গে। এরপর তাঁদের নৌকা চালাতে বলা হতো। এরপর চর দুয়ানী দিয়ে বলেশ্বর নদে যেতেন।

আব্বাস মল্লিক বলেন, ‘আমাদের আরও গভীর পানিতে যেতে বলা হতো। আমরা সেখান থেকে এক–দেড় ঘণ্টা বোট চালিয়ে গভীর পানিতে যেতাম। গভীর পানিতে গিয়ে আমরা নৌকা ধীরগতিতে চালাতাম। ট্রলারের পাটাতনের নিচের অংশ বলে খোন্দা আর ওপরের ছাউনিসংবলিত ঘরকে বলে ব্রিজ। গভীর পানিতে যাওয়ার পর বন্দীদের ব্রিজ ও খোন্দা থেকে বের করে আনত। আমাদের ট্রলার/বোটের দুই সাইডে সাপোর্ট নামক একটি অংশ থাকে। একজন বন্দীকে বের করার পর দুজন র‍্যাব সদস্য সেই বন্দীকে সাপোর্টের ওপর বসিয়ে চেপে ধরে রাখত। এরপর জিয়া স্যার ওই বন্দীর মাথায়, কানে অথবা বুকে গুলি করত। কোনো বন্দীকে একটি গুলি করত, কোনো বন্দীকে দুটি গুলি করত। এরপর ওই মৃত বন্দীর গলায় অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বাঁধা হতো। এরপর ওই বন্দীর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এভাবে এক এক করে মারার পর সুন্দরবন যেত। সুন্দরবন যাওয়ার পর অন্য বন্দীদের বোট থেকে বের করে নাটক সাজিয়ে তাদের হত্যা করা হতো।’

পরে র‍্যাব সাংবাদিকদের ফোন দিয়ে ডেকে আনত উল্লেখ করে আব্বাস মল্লিক বলেন, এরপর বিভিন্ন থানায় লাশগুলো জমা দিত। নৌকাগুলো ধুয়ে তাঁরা চর দুয়ানীতে আসতেন। নৌকা ধোয়ার প্রয়োজন হতো এই কারণে যে বন্দীদের পেট কেটে ফেলা হতো। এর ফলে নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে আসত। মগজ বের হয়ে আসত এবং বন্দীদের শরীর থেকে রক্ত প্রবাহিত হতো। এরপর তাঁরা সুন্দরবন থেকে চর দুয়ানী বরফমিলে ফিরে যেতেন। পরে মেজর সাব্বির বলতেন, ‘তোমাদেরকে জিয়া স্যার ডাকে।’ তাঁরা মাঝিরা জিয়াউলের কাছে যেতেন। জিয়াউলের কাছে গেলে তাঁদের (সাক্ষীসহ অন্য মাঝি) প্রত্যেককে কখনো দুই হাজার, কখনো পাঁচ হাজার টাকা দিতেন। টাকাগুলো খামে করে দেওয়া হতো। তাঁর ছোট ভাই আলকাছ র‍্যাবের সঙ্গেই কাজ করতেন।

আব্বাস মল্লিক বলেন, তাঁর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক নিখোঁজ। আলকাছ মাঝেমধ্যে তাঁদের সঙ্গে নদে মাছ ধরতে যেতেন। মাঝেমধ্যে দোকানে বসতেন। মুদির দোকান করতেন। যে নৌকায় করে নদীতে মাছ ধরতে যেতেন, এর মালিক ছিলেন তাঁর ছোট ভাই আলকাছ মল্লিক। আলকাছ কিছু লেখাপড়া জনতেন। ২৫-২৬ বছর আগে সৌদি আরব যান। সেখানে ছয় থেকে সাত বছর কাজ করে আবার চর দুয়ানী ফিরে আসেন আলকাছ। ফিরে এসে চর দুয়ানীতে দুটি মাছ ধরার ট্রলার/বোট তৈরি করেন। একটার দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয় এবং অপরটির দায়িত্ব জলিল মাঝিকে দেওয়া হয়। তাঁরা নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন। মাঝেমধ্যে আলকাছ মল্লিকও তাঁদের সঙ্গে যেতেন।

২০১১ সালের মাঝামাঝি র‍্যাব থেকে আলকাছ মাঝিকে ফোন দিয়ে বলা হয়, ‘জিয়া স্যার তোমাকে বটতলা মানিকখালী আসতে বলেছে’ উল্লেখ করে আব্বাস মল্লিক বলেন, র‍্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে আলকাছ মাঝি বাজারে আলোচনা করতেন। তখন অন্য বোটের মালিকেরা আলকাছকে বলতেন, র‍্যাব তোমার ওপর খুব খ্যাপা। ২০১১ সালের মাঝামাঝি কোনো একদিন র‍্যাবের পরিচয় দিয়ে আলকছাকে ফোন করা হলে সেদিনেই আলকাছ দুপুরে ভাত খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। ওই দিন সন্ধ্যায় আলকাছের স্ত্রী তাঁকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘মাইজা ভাই, আলকাছ র‍্যাবের ফোন পেয়ে জিয়া স্যারের সাথে দেখা করতে বটতলা মানিকখালী গেছে, এখন তার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।’ এরপর আর পাওয়া যায়নি।