রাষ্ট্রভাষার সংগ্রাম

ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথ দেখাল ৫২

ভাষা আন্দোলন এ দেশের মূলত মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবনে এক অভূতপূর্ব চেতনার সূচনা করেছিল। জাতি ও ভাষার আত্মপরিচয়কেন্দ্রিক এই সাংস্কৃতিক জাগরণ নতুন রাজনৈতিক পরিচয় খুঁজে নেওয়ার পথ সুগম করে দেয়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে সংঘটিত প্রথম পর্যায়ের ভাষা আন্দোলন মূলত ঢাকার ছাত্রসমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু মাত্র চার বছরের ব্যবধানে ১৯৫২ সালের জানুয়ারি-মার্চ মাসে এর দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলন সচেতনতা, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং প্রদেশব্যাপী বিস্তৃতির দিক থেকে এতটাই ব্যাপকতা লাভ করে যে এই পরিবর্তন ছিল সম্পূর্ণ গুণগত।

মার্ক্সবাদী লেখক ও প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনকে ‘মুসলমান বাঙালি মধ্যবিত্তের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিকূল শক্তি এবং সংস্কার এ পরিবর্তনকে প্রতিহত করা সত্ত্বেও ঘরে ফেরার এ সংগ্রাম রইলো অব্যাহত এবং তারা জয় করে চললো একের পর এক ভূমি—স্বীকৃত হলো রাষ্ট্রভাষা বাঙলা, বাঙলা সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্য; স্বীকৃত হলো রবীন্দ্রনাথ এবং পহেলা বৈশাখ। এ স্বীকৃতির কোন কোনটি এলো সরকারী ঘোষণাপত্রে কিন্তু তার সত্যিকার ক্ষেত্র হলো পূর্ব পাকিস্তানী মুসলমান মধ্যবিত্তের বিস্তীর্ণ মানসলোক।’ (প্রবন্ধ: মুসলমানদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, বদরুদ্দীন উমর)।

এ ভূমির মানুষের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে ভাষা আন্দোলন যে পথরেখা তৈরি করেছিল, তা ছিল সত্যিকার অর্থেই বিপ্লববাদী। ফলে ‘মহান একুশে’ হয়ে ওঠে পরবর্তী প্রতিটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রাণদায়ী প্রেরণা। সে সময়কার পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসকেরা কেবল গুলিবর্ষণ ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, তীব্র দমন-পীড়নের পথও বেছে নিয়েছিল। এই হত্যা ও নিপীড়নের বিপরীতে সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনীতিকে আশ্রয় করে স্বাধিকার চেতনা দানা বাঁধতে থাকে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণের যে স্থানে শহীদদের রক্ত ঝরেছিল, ঠিক সেখানেই ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা নির্মাণ করেন প্রথম শহীদ মিনার। কয়েক দিনের মাথাতেই পুলিশ ও সেনাবাহিনী তা গুঁড়িয়ে দেয়। এর এক বছর পর সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ১৯৫৩ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালনের আহ্বান জানায়। এই আহ্বানে সাধারণ মানুষ অভূতপূর্ব সাড়া দেয় এবং দেশব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় প্রথম শহীদ দিবস পালিত হয়। সেদিন ভোরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণ থেকে আজিমপুর কবরস্থান পর্যন্ত এক বিশাল শোকমিছিল বের করা হয়। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এর বিবরণ থেকে প্রথম শহীদ দিবস পালনের চিত্রটি এমনভাবে জানা যায়: ‘ভোরে ছাত্র-জনতা যখন দলে-দলে “প্রভাত-ফেরি” করে শহীদদের মাজারে পুষ্প অর্পণ করতে যাচ্ছিলেন, তখন শহরে করুণ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সকলের চোখে পানি, কিন্তু চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে দৃঢ় প্রত্যয়।’

প্রথম শহীদ দিবস উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে ইত্তেফাক, সৈনিক, নও-বেলালসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা বিশেষ ‘শহীদ দিবস সংখ্যা’ প্রকাশ করে। এ ছাড়া ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাস থেকে ১/৪ ডিমাই মাপের একটি প্রচারপত্রও বের করা হয়। একই বছরের মার্চ মাসে হাসান হাফিজুর রহমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক সাহিত্য সংকলন একুশে ফেব্রুয়ারি। এতে আলী আশরাফ, শামসুর রাহমান, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আবদুল গণি হাজারী, ফজলে লোহানী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আনিস চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, জামালুদ্দিন, আতাউর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান হাফিজুর রহমান, শওকত ওসমান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, আনিসুজ্জামান, সিরাজুল ইসলাম, আতোয়ার রহমান, মুর্তজা বশীর, সালেহ আহমদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, তফাজ্জল হোসেন এবং কবিরউদ্দিন আহমদের মতো প্রগতিশীল কবি ও লেখকদের কবিতা, নাটক, গল্প ও প্রবন্ধ স্থান পায়। একুশের এই প্রথম সংকলন মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। ফলে প্রকাশকের আস্তানায় পুলিশ তল্লাশি চালায় এবং সংকলনটি নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৬ সালে আতাউর রহমান খান মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির রাজনৈতিক চৈতন্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এনে দিয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ছয় বছরের মাথায় ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা আইনসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের চরম ভরাডুবি ঘটে; উন্মেষ ঘটে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির। আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, গণতন্ত্রী দল, নেজামে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘যুক্তফ্রন্ট’। তৎকালীন রাজনীতিতে এই যুক্তফ্রন্ট গঠন ছিল একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার ইশতেহারকে এ ভূমির রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার প্রথম দাবিই ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে এবং মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মূলত এটি ছিল একুশের চেতনারই এক বিশাল রাজনৈতিক জয়। রাজনীতিক ও সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর গ্রন্থে বলেছেন, এই ২১ দফা তৈরি করা হয়েছিল একুশের প্রেরণা থেকে।

দীর্ঘ লড়াই ও অসীম আত্মত্যাগের পর ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান কার্যকর হয়। এই সংবিধানের ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘উর্দু এবং বাংলা হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ দীর্ঘ ৯ বছরের সংগ্রাম শেষে এভাবেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি চূড়ান্ত সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করে। বলা বাহুল্য, বায়ান্নর প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের হাত ধরেই বাঙালিরা স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার আন্দোলনের দিকে ধাবিত হয়েছিল।

তথ্যসূত্র:

১. পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি: বদরুদ্দীন উমর

২. সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা: বদরুদ্দীন উমর

২. ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস: বশীর আল-হেলাল

৩. লাল সালাম: বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি: মতিউর রহমান