চাঁপাইনবাবগঞ্জের `কানসাট বাজার' ও তার আশেপাশের এলাকায় গেলে বোঝা যায় আম থেকে কীভাবে ‘আমেজিং’ ট্যুর হয়। ছবি: প্রথম আলো
চাঁপাইনবাবগঞ্জের `কানসাট বাজার' ও তার আশেপাশের এলাকায় গেলে বোঝা যায় আম থেকে কীভাবে ‘আমেজিং’ ট্যুর হয়। ছবি: প্রথম আলো

‘আম থেকে আমেজিং’

আম চাষে বাণিজ্যের পাশাপাশি বাড়ছে ‘ম্যাঙ্গো ট্যুরিজমের’ সম্ভাবনা

শহরের যান্ত্রিক কোলাহল আর নাগরিক ক্লান্তি যখন মনকে চেপে ধরে, তখন এক টুকরা খাঁটি আনন্দের খোঁজ মানুষকে টেনে নিয়ে যায় প্রকৃতির সান্নিধ্যে। আর সেই স্থান যদি হয় গাছের সবুজ পাতার আড়ালে ঝুলতে থাকা মনকাড়া পাকা আমের বাগান, তাহলে আনন্দ রূপ নেয় এক অনন্য উৎসবে।

তেমনই একটি স্থান দেশের উত্তর-পশ্চিমের সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। প্রতিবছর এই জেলায় প্রায় চার লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। আর এই বিশাল আম-সাম্রাজ্যের হৃৎপিণ্ড হলো বিখ্যাত কানসাট বাজার।

ভোরের নরম আলো যখন একটু একটু করে ফোটে, তখনই চোখে পড়ে কানসাট হাটের চিরচেনা সেই রূপ। মাইলের পর মাইলজুড়ে কেবল শত শত ভ্যান আর আমের ঝুড়ি। ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, চটের বস্তা টানার শব্দ আর কুরিয়ার বক্স প্যাক করার চড়চড় আওয়াজে চারপাশ মুখর। এটি কেবল একটি বাজার নয়, যেন এক বিশাল অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম। এই হাটের বাতাসে মিশে আছে কাঁচা-পাকা আমের সুবাস আর হাজারো মানুষের জীবিকার স্বপ্ন।

হাটে আসা আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি এখনকার বড় আকর্ষণ তরুণ অনলাইন উদ্যোক্তারা। তাঁরা ফোনে অনবরত অর্ডার নিচ্ছেন, ছবি তুলছেন আর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তেমনই একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমচাষি মাসুদ রানা। এবার আমের উৎপাদন ও বিক্রি দুটোই বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের রাজধানী। এটা শুধু দেশের নয়, উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমবাজার। আমি কানসাট বাজারের পাশাপাশি অনলাইনেও আম বিক্রি করি। যার মাধ্যমে পুরো দেশের গ্রাহকদের কাছে আমার আম পৌঁছে দিতে পারি।’

বর্তমানে বাজারে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি, ল্যাংড়া আম পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এরপর আসবে ফজলি, আম্রপালি, আশ্বিনা ও গৌড়মতি আম।

আমবাগান ও ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম

কানসাট হাট পার হয়ে একটু ভেতরে গেলেই দেখা মেলে চোখজুড়ানো রোদেলা আমবাগান। গাছের নিচু ডালে ঝুলে আছে বড় বড় তাজা আম। তবে চাঁপাই বা রাজশাহীর এই আমবাগানগুলো এখন আর শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এখানে ডালপালা মেলেছে এক নতুন সম্ভাবনা, যার নাম ‘ম্যাঙ্গো ট্যুরিজম’।

দেশের নানা প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই ছুটে আসেন এসব বাগানে। ইট-পাথরের শহরে বড় হওয়া ছোট ছেলেমেয়েরা নিজ হাতে গাছ থেকে আম পাড়ার চেষ্টা করছে, পাকা আমে মুখ মাখামাখি করে হাসছে—এমন খাঁটি আনন্দের নানা দৃশ্য সারা দিনই চোখে পড়ছে।

বাগান পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সম্পর্কে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘এ রকম বাজার দেশের মধ্যে আমাদের চাঁপাইতেই আছে। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে এসেছি। পড়াশোনার বাইরে তো ওদের এ রকম প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘোরার খুব একটা সুযোগ ও অভিজ্ঞতা নেই। সেটার সঙ্গে পরিচয় করাতেই এখানে এনেছি। তার খুব ভালো লেগেছে এবং সে খুবই উচ্ছ্বসিত।’

কানেকটিভিটি যখন বদলে দেয় অর্থনীতির চাকা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের এই উৎসব ও অর্থনীতির পেছনে যে শক্তিটি অলক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, তা হলো ডিজিটাল কানেকটিভিটি। কানসাটের আমবাজারের ভেতরে থাকা গ্রামীণফোনের ‘আম থেকে আমেজিং’ নামের এক্সপেরিয়েন্স বুথটি সে রকমই একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। দর্শনার্থীদেরও আকর্ষণ করেছে ভিন্নধর্মী এই উদ্যোগ।

কানসাটের আম বাজারে গ্রামীণফোনের ‘আম থেকে আমেজিং’ নামের এক্সপেরিয়েন্স বুথটি দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে

ডিজিটাল সাপোর্টের এই ভূমিকা নিয়ে গ্রামীণফোন লিমিটেডের রাজশাহীর সার্কেল মার্কেটিং হেড মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘আমরা এখানকার পুরো ইকোসিস্টেমটা কাছ থেকে দেখতে ও বুঝতে এসেছি। একসময় আমচাষিদের কেবল স্থানীয় আড়তদারদের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু শক্তিশালী ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের কল্যাণে আজ প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন চাষি বা তরুণ উদ্যোক্তাও সরাসরি ফেসবুক বা অনলাইনের মাধ্যমে গ্রাহকের বাসায় পৌঁছে দিচ্ছেন বাগানের তাজা আম।’

মো. মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, ‘চাষির বাগান থেকে গ্রাহকের হাতে আম পৌঁছানোর পুরো জার্নিটা সহজ করে দিয়েছে ইন্টারনেট কানেকটিভিটি। আর আমের মৌসুমে এই অঞ্চলে নেটওয়ার্কের ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়। তাই আমাদের গ্রাহকেরা যাতে কোনো বাধা ছাড়াই নিশ্চিন্তে নিরবচ্ছিন্ন সেবা পান, সে জন্য আমরা নেটওয়ার্কের সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছি।’

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও জমজমাট হয় কানসাটের আমের হাট। বোঝা যায় একটা সাধারণ আম কীভাবে লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা আর স্বপ্নকে এক সুতায় বেঁধে ফেলেছে। ব্যবসায়ী আর আমচাষির অভিজ্ঞতা, তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস আর আমবাগানে ঘুরতে আসা পরিবারের চোখে-মুখে নতুন কিছু প্রাপ্তির আনন্দ—সবকিছুই সম্ভব হচ্ছে সঠিক সময়ে নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক সেবার কারণে।