৫ বছর ৯ মাসে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু ৩০০ কারাবন্দীর

  • দেশে কারাগারের সংখ্যা ৭৫। বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার।

  • এখন বন্দী রয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজারের বেশি মানুষ।

  • ৭৫ কারা হাসপাতালে অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮। তবে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন।

  • ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর ৯ মাসে ১,২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।

কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে একের পর এক বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও মৃত্যু হচ্ছে অনেকের। অনেক ক্ষেত্রেই বন্দীর বয়স বেশি নয়। অর্থাৎ অকালমৃত্যু হচ্ছে।

কারা অধিদপ্তর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর ৯ মাসে ১২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান অন্তত ৩০০ জন বন্দী।

হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্দীর মৃত্যুর সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার রাতে। মৃত বন্দীর নাম আবু তাহের (৩৪)। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, আবু তাহেরকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ থেকে অসুস্থ অবস্থায় গতকাল রাত সোয়া ৯টার দিকে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আনা হয়। সেখানকার জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল।

কারা অধিদপ্তরের গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হিসাব এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ চলতি বছরের শুরু থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে চলতি বছর মাসে গড় মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২৮ জনের। ৫ বছর ৯ মাসের হিসাবে, মাসে গড় মৃত্যু প্রায় ১৮। দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর বন্দী–মৃত্যু বেশি।

স্বজনদের অভিযোগ, কারাগারগুলোতে বন্দীদের রাখা হয় গাদাগাদি করে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এমন পরিবেশে থেকে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকের আগে থেকেই অসুস্থতা থাকে। বন্দীদের অনেকেই যথাসময়ে চিকিৎসা পান না। এতে তাঁদের মৃত্যু হয়।

হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যুর ঘটনায়

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কেরানীগঞ্জ

উদ্বিগ্ন কারা অধিদপ্তরও। গত ২৫ জানুয়ারি কারা অধিদপ্তর সব জেল সুপারকে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, ইদানীং বিভিন্ন কারাগারে ‘ব্রট ইন ডেড’ (মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া) আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে এসেছে। চিঠিতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, কারাগারগুলোতে বন্দীদের রাখা হয় গাদাগাদি করে এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। এমন পরিবেশে থেকে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকের আগে থেকেই অসুস্থতা থাকে। বন্দীদের অনেকেই যথাসময়ে চিকিৎসা পান না। এতে তাঁদের মৃত্যু হয়।

চিকিৎসা–সুবিধার স্বল্পতার কথা কারা কর্তৃপক্ষও স্বীকার করে। তারা বলছে, সমস্যাটি বহু বছরের। তবে তা সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, কোনো মৃত্যু কাম্য নয়। বর্তমানে বন্দীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স–সংকট চলছে। অস্থায়ী ভিত্তিতে আসা চিকিৎসকেরাও দুই ঘণ্টার বেশি কারা হাসপাতালে থাকেন না। প্রয়োজনের সময় যানবাহন ভাড়া করে বাইরের হাসপাতালে বন্দী রোগীকে পাঠাতে দেরি হয়।

উদাহরণ দিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর দরকার হলে যানজটের কারণে অন্তত তিন ঘণ্টা লেগে যায়। এ অবস্থায় অনেক সময় পথে বন্দী মারা যান। দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। এসব বন্দীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধ্যমে ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে পাঠাতে সময় ক্ষেপণ হয়। কারা হাসপাতালে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া গেলে হয়তো বন্দীরা বেঁচে যেতেও পারতেন।

সাধারণত দেশের কারাগারগুলোতে ৮০-৮২ হাজার বন্দী থাকেন। গতকালের হিসাবে বন্দীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬ হাজারে। কারাগারের বন্দী ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬।

কোনো মৃত্যু কাম্য নয়। বর্তমানে বন্দীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মৃত্যু বেড়ে গেছে।
কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন)

বন্দী কেন বেড়েছে

কারাগারে নানা অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাখা হয়। আবার মামলা চলা অবস্থায় জামিন না পাওয়া আসামিরাও বন্দী থাকেন। দেশে ৭৫টি কারাগার আছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার, ৬০টি জেলা কারাগার।

কারা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে তাদের ‘মিশন’ হিসেবে লেখা রয়েছে পাঁচটি বিষয়। সেগুলো হলো বন্দীদের নিরাপদ আটক নিশ্চিত করা; কারাগারের কঠোর নিরাপত্তা ও বন্দীদের মাঝে শৃঙ্খলা বজায় রাখা; বন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা, যথাযথভাবে তাদের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা এবং আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব ও আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ নিশ্চিত করা এবং একজন সুনাগরিক হিসেবে সমাজে পুনর্বাসন করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মোটিভেশন (উৎসাহ) ও প্রশিক্ষণ দেওয়া।

প্রশ্ন হলো, একজনের জায়গায় আড়াইজনের কাছাকাছি বন্দী রেখে যথাযথভাবে বাসস্থান, খাদ্য ও চিকিৎসা–সুবিধা দেওয়া সম্ভব কি না।

কারাগারগুলোতে বছরওয়ারি কত বন্দী ছিলেন, তার একটি হিসাব পাওয়া যায় ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ নামের একটি ওয়েবসাইটে। সেখানে প্রতি দুই বছর অন্তর বন্দীর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০১৪ সালে কারাগারে বন্দী ছিলেন ৬৫ হাজার ৬৬২ জন। এর পর থেকে তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২০ সালে বন্দী ছিলেন ৮৮ হাজারের মতো।

ওয়েবসাইটটিতে ২০০০ সাল থেকে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, বন্দীর সংখ্যা কখনো লাখ ছাড়ায়নি। অবশ্য চলতি মাস সেপ্টেম্বরের হিসাবে বন্দী ১ লাখ ২ হাজারের কিছু বেশি। কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে যা আরও ৪ হাজার বেড়েছে। উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বন্দীর সংখ্যা ছিল ৭৮ হাজার।

কারা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্রেপ্তার বেশি হচ্ছে। মাদক মামলা, ছিনতাই, সাইবার অপরাধসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা গ্রেপ্তার হচ্ছেন। পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলায়ও অনেককে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। আগে বন্দী থাকা অনেকে দিনের পর দিন জামিন পাচ্ছেন না। এতে কারাগারে বন্দী বাড়ছে।

৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স আছে ২৭টি। কারা হাসপাতাল থেকে বাইরের কোনো হাসপাতালে অসুস্থ বন্দীকে পাঠাতে হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অন্য যানবাহনে করে পাঠাতে হয়। এসব যানবাহনে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে না।

চিকিৎসক–সংকট

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮। তবে স্থায়ী চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র দুজন। তাঁদের একজন মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আরেকজন রাজশাহী কারা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছেন।

কারা সূত্র জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট জেলার সিভিল সার্জনের দপ্তর থেকে কারা হাসপাতালে অস্থায়ী ভিত্তিতে ১০১ জন চিকিৎসক পাঠানো হয়। তাঁরা দিনে কয়েক ঘণ্টা করে হাসপাতালে থাকেন। ফলে দুপুরের পর থেকে কোনো বন্দী অসুস্থ হলে তাঁদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অ্যাম্বুলেন্স আছে ২৭টি। কারা হাসপাতাল থেকে বাইরের কোনো হাসপাতালে অসুস্থ বন্দীকে পাঠাতে হলে অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যায় না। তখন অন্য যানবাহনে করে পাঠাতে হয়। এসব যানবাহনে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে না।

সম্প্রতি একের পর এক বন্দীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪০ মিনিটের ব্যবধানে দুই কারাবন্দীর মৃত্যু হয়। তাঁরা দুজনই কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ছিলেন। মৃত ব্যক্তিরা হলেন পরশ তালুকদার (৩৫) ও স্বপন চন্দ্র দাস (৫৯)। এর মধ্যে একজনকে হাসপাতালে আনার সঙ্গে সঙ্গে মৃত ঘোষণা করা হয়।

২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তাঁরা হলেন তোফাজ্জল ওরফে পলাশ (৩৮) ও ইফতেখার মাহমুদ (৩৬)। দেখা যাচ্ছে, তাঁদের দুজনের বয়সই ৪০-এর নিচে। ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফরিদপুর জেলা কারাগারের বন্দী আসাদুজ্জামান শেখ (৪২) ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন ওয়ার্ডে মারা যান।

ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গত শনিবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের কিশোরগঞ্জের নেতা খাইরুল আমিন রুহুল সরকারের (৫০)।

কারা অধিদপ্তর ও কারা হাসপাতাল সূত্র বলছে, বন্দীদের মধ্যে অনেকেই হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, চর্ম, দন্তসহ নানা রোগে ভুগছেন। ফলে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা দরকার।

কারাগার সূত্রে জানা গেছে, বুকে ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে খাইরুলকে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিকেলে তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে তাঁকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

খাইরুল আমিন রুহুল সরকারের বড় ভাই মো. নুরুল আমীন বলেন, খাইরুল কারাবন্দী অবস্থায় তিন দিন ধরে বুকে ব্যথার কথা জানিয়েছিলেন। যথাসময়ে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পেলে হয়তো তাঁর শারীরিক অবস্থা এতটা সংকটাপন্ন হতো না।

কারা অধিদপ্তর ও কারা হাসপাতাল সূত্র বলছে, বন্দীদের মধ্যে অনেকেই হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ও লিভারের রোগ, ডায়াবেটিস, চর্ম, দন্তসহ নানা রোগে ভুগছেন। ফলে রোগীদের নিয়মিত চিকিৎসা দরকার।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিনীতা রায় গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাড়ে ১৩ হাজার বন্দী আছেন। এই কারা হাসপাতালে থাকার কথা ৭ জন চিকিৎসকের। তিনিসহ দুজন চিকিৎসক এখানে সংযুক্ত অবস্থায় আছেন। তিনি বলেন, এই কারা হাসপাতালে বিশেষায়িত কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয় না। অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসার জন্য এখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিসহ ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এখানে চিকিৎসা যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবলের অভাবে রোগ পরীক্ষা খুব কম হয়।

নিয়মানুযায়ী প্রতিটি কারাগারে একজন মানসিক চিকিৎসক থাকার কথা। তবে তা নেই। নারী বন্দী আছেন তিন হাজারের মতো। নেই কোনো গাইনি চিকিৎসক।

অস্থায়ী চিকিৎসকেরা বলছেন, দিনে তিন থেকে চার শ বন্দীকে তাঁদের চিকিৎসা দিতে হয়। রোগীর চাপ অত্যধিক বেশি। অন্যদিকে পদোন্নতি ও চাকরির সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় কারা হাসপাতালে চিকিৎসকেরা থাকতে চান না।

এসব মৃত্যু নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। এর দায় রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। এসব অপরাধমূলক অবহেলা।
মো. নুর খান, মানবাধিকারকর্মী

‘রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারে না’

২০১৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ রেজুলেশন ৭০/১৭৫-এর মাধ্যমে বন্দীদের প্রতি আচরণের জন্য জাতিসংঘের ন্যূনতম মানদণ্ড (ইউনাইটেড ন্যাশনস স্ট্যান্ডার্ড মিনিমাম রুলস ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনার্স) গ্রহণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নামকরণ করে নেলসন ম্যান্ডেলা রুলস।

নেলসন ম্যান্ডেলা রুলসের মূল বক্তব্য হলো, বন্দীকে অমানবিক পরিবেশে রাখা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কিংবা তাঁর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কোনোভাবেই শাস্তির অংশ হতে পারে না। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় বন্দীর জীবন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রেরই।

জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান প্রথম আলোকে বলেন, বন্দীরা কারাগারে রাষ্ট্রীয় ও নিরাপদ হেফাজতে আছেন ধরে নিতে হবে। আইন অনুযায়ী তাঁর যতটুকু খাবার পাওয়ার কথা, সেই পরিমাণ খাবার দেওয়া, যতটুকু ঘুমানোর জায়গার দরকার, তা নিশ্চিত করতে হবে। অথচ কারাগারে ১০ জনের জায়গায় ১৫ জন গাদাগাদি করে থাকছেন। সন্ধ্যার পর কারাগারে হৃদ্‌রোগ বা স্ট্রোকে (মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ) আক্রান্ত হলে বন্দীর জরুরি চিকিৎসার দরকার হয়। চিকিৎসক–সংকটে তা দেওয়া যায় না। রাতে কোনো বন্দী হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হলে অ্যাম্বুলেন্স বা পরিবহন সংকটের কারণে তাঁদের স্থানান্তর করা যায় না।

নুর খান বলেন, এসব মৃত্যু নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। এর দায় রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। এসব অপরাধমূলক অবহেলা।