
একসময় ভেবেছিলেন আর পড়বেনই না। তবে পরে নিজেই এই সিদ্ধান্ত বদল করেন।দীর্ঘ বিরতির বিরতির পর জরিমানা দিয়ে ভর্তি হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেন। অবশেষে ৫১ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করেন মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১ সেপ্টেম্বর। এই পরীক্ষায় হাবিবুল্লাহ পাস করেন।
ফলাফল প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বন্ধু, শিক্ষকসহ পরিচিতদের কাছ থেকে শুভেচ্ছাবার্তা পাচ্ছেন হাবিবুল্লাহ। বিভিন্ন গণমাধ্যম তাঁর সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। এই ব্যস্ততার ফাঁকে তিনি প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন।
হাবিবুল্লাহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘কে-৫৩’ ব্যাচের (সেশন ১৯৯৫-১৯৯৬) শিক্ষার্থী ছিলেন। আর এখন ‘কে-৭৮’ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমবিবিএস পাস করলেন।
৫১ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করে কেমন লাগছে, জানতে চাইলে হেসে উত্তর দিলেন হাবিবুল্লাহ। বললেন, এই যাত্রায় তাঁকে অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে। এখন তিনি নিজের নামে ‘ডাক্তার’ পদবি ব্যবহার করতে পারবেন।
হাবিবুল্লাহ জানালেন, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘কে-৫৩’ ব্যাচের (সেশন ১৯৯৫-১৯৯৬) শিক্ষার্থী ছিলেন। আর এখন ‘কে-৭৮’ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমবিবিএস পাস করলেন। ২০০২ সালে তাঁর এমবিবিএস পাস করার কথা ছিল। কিন্তু পাস করলেন ২০২৬ সালে। এর মধ্যে কেটে গেছে ২৪টি বছর।
দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বন্ধু, শিক্ষকসহ সবার সহযোগিতায় আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে এমবিবিএস শেষ করতে পেরেছেন বলে জানালেন হাবিবুল্লাহ। এ জন্য তিনি বিশেষ করে বন্ধু ও শিক্ষকদের নাম ধরে ধরে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন। এ প্রসঙ্গে বললেন, তাঁর বন্ধুদের অনেকে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যাপক হওয়ার পথে আছেন।
২০২৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলু। তিনি বলেন, সেই সময় এক দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন হাবিবুল্লাহ। তখনই হাবিবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। সাক্ষাতে হাবিবুল্লাহ তাঁকে বলেন, নানা জটিলতায় তাঁর পড়াশোনা দীর্ঘদিন থমকে ছিল। কিন্তু তিনি এখন আবার ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করতে চান।
হাবিবুল্লাহ প্রথমবার মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাননি। পরেরবার তিনি ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সুযোগ পান। তাঁর ক্লাস শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এসব তথ্য জানিয়ে হাবিবুল্লাহ বললেন, শুরুর দিকে তিনি ফলাফল ভালোই করছিলেন। একপর্যায়ে এক শিক্ষকের সঙ্গে তাঁর ঝামেলা শুরু হয়। তবে এখন আর তিনি এই বিষয়ের বিস্তারিত বলতে চান না।
একসময় হাবিবুল্লাহ ভেবেছিলেন, আর পড়বেনই না। তিনি বলেন, দোটানার মধ্যে পিছিয়ে পড়তে থাকেন। পিছিয়ে পড়ে জুনিয়রদের সঙ্গে তাঁকে ক্লাস করতে হতো। এতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। একদিকে পড়াশোনায় জটিলতা, অন্যদিকে পারিবারিক নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। ফলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে থাকেন।
হাবিবুল্লাহর বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক। তিনি পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বাবা সিভিল সার্জন হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যক্তিগত চেম্বারে তিনি রোগীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ টাকা ফি নিতেন। স্ত্রী, সাত ছেলে-মেয়ে নিয়ে আবু বক্করের বড় পরিবারে আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। এই আর্থিক টানাটানির বিষয়টি হাবিবুল্লাহর জীবনেও প্রভাব ফেলেছিল। হাবিবুল্লাহর বাবা ২০০০ সালে মারা যান। আর মা মারা যান ২০১৬ সালে।
২০২৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলু। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সেই সময় এক দিন তাঁর সঙ্গে দেখা করেন হাবিবুল্লাহ। তখনই হাবিবুল্লাহর সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয়। সাক্ষাতে হাবিবুল্লাহ তাঁকে বলেন, নানা জটিলতায় তাঁর পড়াশোনা দীর্ঘদিন থমকে ছিল। কিন্তু তিনি এখন আবার ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করতে চান।
এই দীর্ঘ শিক্ষা বিরতির পর ভর্তির জন্য জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ টাকা। এই তথ্য জানিয়ে অধ্যাপক আবদুল হানিফ বলেন, তখন তিনি মেডিকেলের স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। এই কমিটি, হাবিবুল্লাহ নিজে এবং ‘কে-৫৩’ ব্যাচের বন্ধুদের সহায়তায় দুই লাখ টাকা জোগাড় হয়। আবার ভর্তি হয়ে এক দফা বিরতি দিয়ে তিনি এমবিবিএস শেষ করেন।
হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাসের পর আবদুল হানিফ তাঁর ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। হাবিবুল্লাহর সঙ্গে নিজের ছবিসহ দেওয়া এই পোস্টে তিনি তাঁর এই শিক্ষার্থীসহ অন্য নবীন চিকিৎসকদের অভিনন্দন, শুভকামনা জানান। হাবিবুল্লাহ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, ২৪ বছর পর এমবিবিএস পাস! চেষ্টা থাকলে কি না হয়!
পোস্টে আবদুল হানিফ উল্লেখ করেন, গত ফেব্রুয়ারিতে তাঁর জন্য উপহার নিয়ে এসেছিলেন হাবিবুল্লাহ। উপহারের মধ্যে ছিল হাবিবুল্লাহর প্রয়াত বাবার ব্যবহৃত একটি স্টেথোস্কোপ এবং একটি পবিত্র কোরআন শরিফ। পবিত্র কোরআন শরিফ রেখেছেন তিনি। স্টেথোস্কোপটি ফেরত দিয়েছেন, যাতে হাবিবুল্লাহ সেটি ব্যবহার করতে পারেন।
হাবিবুল্লাহর ইচ্ছাশক্তি তো ছিলই, পাশাপাশি অন্যরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁর পক্ষে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলু, সাবেক উপাধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। নিজেই নিজেকে ‘কাউন্সেলিং’ করেছেন। বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষকেরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ভর্তির ক্ষেত্রে জরিমানার দুই লাখ টাকার মধ্যে এক লাখ টাকা তিনি নিজে দিয়েছেন। বাকি এক লাখ বন্ধু, শিক্ষকসহ অন্যরা দিয়েছিলেন। সবার সহযোগিতা ছিল বলেই তিনি সব বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে এমবিবিএস পাস করতে পেরেছেন।
হাবিবুল্লাহ এখন ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায়। এরপর তিনি সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ বিদ্যায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে চান বলে জানালেন। তিনি বলেন, মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। এই আগ্রহ থেকে তিনি আগে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত একটি পত্রিকার সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
হাবিবুল্লাহ বিয়ে করেছিলেন। ২০০২ সালে কিডনি জটিলতায় তাঁর স্ত্রী মারা যান। হাবিবুল্লাহ বলেন, তিনি জীবনে খুব বেশি কিছু চান না। পেটে-ভাতে মাস পার হলেই তিনি খুশি।
৫১ বছর বয়সে হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাস করার ক্ষেত্রে তাঁর ইচ্ছাশক্তিকে বড় বিষয় মনে করেন অধ্যাপক আবদুল হানিফ। তিনি বলেন, হাবিবুল্লাহর ইচ্ছাশক্তি তো ছিলই, পাশাপাশি অন্যরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই তাঁর পক্ষে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে।
অধ্যাপক আবদুল হানিফ বলেন, মেডিকেল কলেজে দেশের সেরা শিক্ষার্থীরাই ভর্তি হয়। কিন্তু ভর্তির পর পড়াশোনাকালে বিভিন্ন কারণে কিছু শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে। এমন শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকের দিক থেকে একটু বেশি যত্ন দরকার। এ জন্য শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে মেন্টরশিপ ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা দরকার।