শিক্ষকতা
শিক্ষকতা

সমীক্ষার ফল

প্রাথমিক শিক্ষকদের পেশার বাইরে ৩৭ ধরনের কাজ করতে হয়

দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদানসহ নির্ধারিত শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ৩৭ ধরনের পেশাবহির্ভূত (ননপ্রফেশনাল) কাজ করতে হয়। মোট শিক্ষকদের মধ্যে ৮৭ শতাংশকে কোনো না কোনোভাবে পেশাবহির্ভূত কাজে যুক্ত থাকতে হয়। এর ফলে শিক্ষার মান, শিক্ষকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার্থীর শিখনফল—সবকিছুতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার শিক্ষণ ও শিখনগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন’ শীর্ষক মাঠ সমীক্ষার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। আজ মঙ্গলবার ঢাকায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে এক অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের উপস্থিতিতে এই সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। পরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

পাঠদান, শ্রেণি কার্যক্রম, মূল্যায়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম ইত্যাদি শিক্ষকদের পেশাভিত্তিক মূল কাজ। কিন্তু এর বাইরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশে শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয় এমন অনেক কাজ করতে হয়। যেমন ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জন্ম–মৃত্যু জরিপ, শিশু জরিপ ইত্যাদি। এ রকম ৩৭ ধরনের পেশাবহির্ভূত কাজ করতে হয় শিক্ষকদের।

বর্তমানে সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক কোটির বেশি। শিক্ষক রয়েছেন পৌনে চার লাখের বেশি। এর মধ্যে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১৬টি, বর্তমানে কর্মরত প্রায় সাড়ে ৩ লাখ।

সমীক্ষার ফল

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের ৮টি বিভাগের ২১টি জেলার ৫০টি উপজেলার ৮৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং সেখানকার ৪৬৪ জন শিক্ষকের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সমীক্ষাটি করা হয়। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষকদের মধ্যে ৭৯ জন প্রধান শিক্ষক এবং ৩৮৫ জন সহকারী শিক্ষক ছিলেন।

সমীক্ষায় শিক্ষকদের ৩৭ প্রকারের পেশাবহির্ভূত কাজ শনাক্ত করা হয়েছে, যা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের করতে হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জরিপে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয়। তবে বিদ্যালয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ও হোম ভিজিটে সর্বনিম্ন সময় ব্যয় হয়। ননপ্রফেশনাল কাজে মাসিক গড়ে শিক্ষকপ্রতি প্রায় ২৪ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা ব্যয় হচ্ছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, পেশাবহির্ভূত কাজে শিক্ষকেরা বেশি সময় ব্যয় করলে সার্বিকভাবে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কমে যায়। অতিরিক্ত দাপ্তরিক কাজ শেষে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করার পর ৯০ শতাংশ শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পূর্ণ মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর। ৮৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এর ফলে শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারে না এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সমীক্ষার তথ্য বলছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পিছিয়ে পড়া বা সুবিধাবঞ্চিত। এসব শিক্ষার্থীর জন্য ‘রেমিডিয়াল’ বা বিশেষ ক্লাস অপরিহার্য হলেও ৮৫ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, পেশাবহির্ভূত কাজের চাপের কারণে তাঁরা এসব বিশেষ ক্লাস নিতে পারছেন না।

সমীক্ষার ফল বলছে, একজন সহকারী শিক্ষক গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ হাজার ১১৬ টাকার সমপরিমাণ সময় পেশাবহির্ভূত কাজে ব্যয় করেন।

এই গবেষণা বলছে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর পেশাবহির্ভূত কাজের অতিরিক্ত চাপ শিক্ষার মান, শিক্ষকের মানসিক স্বাস্থ্য ও শিক্ষার্থীদের শিখনফল—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পাঁচ সুপারিশ

এমন প্রেক্ষাপটে পাঁচ ধরনের সুপারিশ করা হয়েছে সমীক্ষায়। এক. ক্লাস চলাকালীন কোনো ধরনের তথ্য সংগ্রহ বা প্রশাসনিক কাজ শিক্ষকদের ওপর চাপানো যাবে না। দুই. প্রতিটি বিদ্যালয়ে অফিস সহকারী বা ডিজিটাল সহকারী নিয়োগ। তিন. একক ডিজিটাল পোর্টালের মাধ্যমে সব দাপ্তরিক কাজের সমন্বয়। চার. শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাঁচ. শিক্ষকের পাঠদানের সময় সুরক্ষানীতি প্রণয়ন করা। এসব পদক্ষেপ নিলে শিক্ষার গুণগত মান ও ব্যবস্থার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে বলে সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে প্রতিটি স্কুলকে একটি ‘অটোনোমাস বডি’র মতো গড়ে তুলতে হবে। এতগুলো সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েও অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় খুব ভালোভাবে শিক্ষা দান করছে। বিদ্যালয়গুলো ‘অটোনোমাস বডি’র মতো কাজ করলে শিক্ষার মান আরও ভালো হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান এবং জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির মহাপরিচালক ফরিদ আহমদ।