
একটি দেশের সংস্কৃতি ও মানুষের পরিচয় জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম শিল্পকলা। শিল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষকে আরও ভালোভাবে চেনা যায়। চিত্রকলা, ভাস্কর্য কিংবা সংগীত—শিল্পের প্রতিটি মাধ্যম কোনো জাতির সংস্কৃতি ও পরিচয়কে তুলে ধরে এবং ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন রাজধানীর উত্তরায় গ্যালারি কায়ায় এক অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেন। গ্যালারি কায়ার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার বিকেলে আয়োজিত বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিতি ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। ঘণ্টা বাজিয়ে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন তিনি।
বাংলাদেশি শিল্পীদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘শিল্পকর্মে বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার যে প্রকাশ ঘটে, তা বিদেশিদের জন্য দেশটিকে বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করে। আশা করি, ভবিষ্যতেও এ ধরনের প্রদর্শনীর মাধ্যমে আরও বেশি শিল্পীর কাজ দেখার এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অর্জনের সুযোগ হবে।’
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ও তাঁর স্ত্রী বাংলাদেশি শিল্পকর্ম দেখেছেন এবং শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এসব শিল্পকর্মের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশের মানুষ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন।
শিল্প বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে বলে উল্লেখ করেন ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া অনেক শিল্পী যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে পড়াশোনা, কাজ বা বসবাসের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। সেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার প্রভাব তাঁদের শিল্পকর্মে থাকলেও সেগুলো মূলত বাংলাদেশি শিল্পভাবনার পরিচয়কেই বহন করে।
গ্যালারি কায়াকে ২২ বছর পূর্তির জন্য অভিনন্দন জানিয়ে ভবিষ্যতের সাফল্য কামনা করেন ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। তিনি বলেন, মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে গ্যালারি কায়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত হ্যারি কে টমাস ২২ বছর আগে গ্যালারিটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সেই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন গ্যালারি কায়ার প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী গৌতম চক্রবর্তী। বক্তব্যে দীর্ঘ পথচলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২২ বছরের পথচলায় গ্যালারি কায়া শিল্পচর্চাকে কেবল প্রদর্শনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং নতুন ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের সৃজনশীল উদ্যোগকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেশের শিল্পাঙ্গনে একটি উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
গৌতম চক্রবর্তীর তথ্যমতে, গ্যালারিটি এ পর্যন্ত ১৬২টি একক ও দলীয় প্রদর্শনী, ১০টি আর্ট ক্যাম্প, ৪২টি আর্ট ট্রিপ ও ৯টি আর্ট ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছে। শিল্পের বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল মূল্যকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময় জোরদারের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, শিল্পের গুরুত্ব তার আকার বা ব্যবহৃত মাধ্যমে থাকে না, থাকে শিল্পীর ভাবনা ও প্রকাশে। তেলরং, অ্যাক্রিলিক, জলরং, পেনসিল বা ভাস্কর্য—এসব কেবল প্রকাশের মাধ্যম। কোনো মাধ্যম অন্যটির চেয়ে কম বা বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়। একটি ছোট শিল্পকর্মও তার ভাবনার বিস্তৃতির কারণে বড় হয়ে উঠতে পারে, আবার আকারে বড় কোনো কাজও সেই গভীরতা না থাকলে ছোট মনে হতে পারে। একজন শিল্পী একটি ক্ষুদ্র ক্যানভাসেও পুরো পৃথিবীকে ধারণ করার চেষ্টা করেন, আর সেখানেই শিল্পের প্রকৃত তাৎপর্য।
শিল্পী শহিদ কবীর বলেন, এই প্রদর্শনীর সঙ্গে জড়িত প্রবীণ শিল্পীদের অবদান ও উত্তরাধিকার নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
গ্যালারি কায়ার ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, শিল্পী মোহাম্মদ ইউনূস, কনকচাঁপা চাকমা, কাজী রকিব, মাসুদা কাজী, শম্ভু আচার্যসহ আরও অনেকে।
২০০৪ সালের ২৮ মে প্রতিষ্ঠিত গ্যালারি কায়া রাজধানীর উত্তরার একটি স্বনামধন্য শিল্পকেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির ‘২২তম বার্ষিক প্রদর্শনী’ শিরোনামের এ আয়োজন চলবে ২৬ জুন পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য গ্যালারি খোলা থাকবে। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত।
এই প্রদর্শনীতে জায়গা পেয়েছে ৪৫ শিল্পীর শিল্পকর্ম। এতে মোট ৭৩টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। তেলরং, অ্যাক্রিলিক, কালি, প্যাস্টেল, এচিং, লিথোগ্রাফ, উড এনগ্রেভিং, জলরংসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তৈরি কাজ এতে স্থান পেয়েছে। প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো ১৯৫৭ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে।
প্রদর্শনীতে রামকিঙ্কর বৈজ, এম এফ হুসেইন, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, দেবদাস চক্রবর্তী, জোগেন চৌধুরী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, চন্দ্রশেখর দে, হামিদুজ্জামান খান, শাহাবুদ্দিন আহমেদ, রতন মজুমদার, রণজিৎ দাস, শিশির ভট্টাচার্য, গৌতম চক্রবর্তীসহ বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শিল্পীর শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে।