
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রোগতাত্ত্বিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশে হামের সংক্রমণ কমছে। অন্যদিকে দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যাচ্ছে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা কমছে না। মে মাসের প্রথম দিন এবং গতকাল শেষ দিনে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩ হাজারের ওপরে রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিদপ্তরের তথ্যে ঘাটতি আছে। তথ্য আরও স্পষ্ট ও বিস্তারিত হওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০তম সপ্তাহের (১১–১৭ মে) এবং ২১তম সপ্তাহের (১৮–২৪ মে) রোগতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কমে আসছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যু কমে আসতে আরও কিছু সময় লাগবে।
গতকাল রোববার (৩১ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে, ১ হাজার ৩২৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এ সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৫৩ জনের।
ওই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায় ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৬ হাজার ৮৮৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। এদের মধ্যে ৫২ হাজার ৮৪১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছে। বাকি ৪ হাজার ৪৫ জনের হাসপাতালে থাকার কথা। তবে এদের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে (৪৯৫ জন) এবং নিশ্চিত হামে (৯০ জন) ৫৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ গতকাল প্রায় সাড়ে তিন হাজার রোগী দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০তম সপ্তাহের (১১–১৭ মে) এবং ২১তম সপ্তাহের (১৮–২৪ মে) রোগতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশে হামের প্রাদুর্ভাব কমে আসছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যু কমে আসতে আরও কিছু সময় লাগবে।
ঠিক এক মাস আগে ১ মে দেওয়া তথ্যে সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩১ জনের এবং নিশ্চিত হামে ৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল। মোট মৃত্যু ছিল ২৮০ জনের। ওই সময় হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হাম নিয়ে ৩ হাজার ১৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি ছিল।
মে মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক মাসে মৃত্যু হয়েছে ৩০৫ জনের। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে ও নিশ্চিত হামে দৈনিক ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে মাসের প্রথম দিন ও শেষ দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা তিন হাজারের ওপরেই রয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুরা টিকা পাওয়ার কারণে হার বেশি দেখাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, টিকা দেওয়ার কারণে এবং অনেকে ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে হাম প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছে।
হাসপাতালে কেন রোগী কমছে না—এটি এক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার ৫ এপ্রিল থেকে শিশুদের (৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী) টিকা দেওয়া শুরু করে। টিকা দেওয়ার হার ১০২ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশিসংখ্যক শিশু টিকা পেয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির কর্মকর্তারা বলেছেন, কিছু ক্ষেত্রে ৫ বছরের বেশি বয়সী শিশুরা টিকা পাওয়ার কারণে হার বেশি দেখাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, টিকা দেওয়ার কারণে এবং অনেকে ইতিমধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণে শিশুদের মধ্যে হাম প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তার কারণে হামের প্রকোপ কমে এসেছে।
হামের প্রকোপ কমে আসার তথ্য পাওয়া যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাপ্তাহিক রোগতাত্ত্বিক পরিসংখ্যানে। ২৬ মের প্রতিবেদনে ১৮ থেকে ২৪ মের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ওই সাত দিনে আগের সপ্তাহের (১১–১৭ মে) চেয়ে দেশে নিশ্চিত হামের রোগী ২২ শতাংশ কমেছে এবং হামের উপসর্গ থাকা রোগীর সংখ্যা ২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৪৫ শতাংশ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০ শতাংশ বেড়েছে।
এর আগের সপ্তাহের অর্থাৎ ১৯ মের প্রতিবেদনে ১১ থেকে ১৭ মের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, আগের সপ্তাহের (৩–১০ মে) চেয়ে দেশে নিশ্চিত হামের রোগী ৪৪ শতাংশ কমেছে এবং হামের উপসর্গ থাকা রোগীর সংখ্যা ১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ২৬ শতাংশ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৩৩ শতাংশ কমেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরপর দুই সপ্তাহের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ১১ থেকে ২৪ মের মধ্যে নিশ্চিত হামের রোগী উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, হামের উপসর্গ থাকা রোগী কিছু বেড়েছে। এ সময় এক সপ্তাহে মৃত্যু কমেছে, পরের সপ্তাহে মৃত্যু বেড়েছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য দেশের ৭৫৯টি স্থান থেকে প্রতি সপ্তাহে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
২৬ মের প্রতিবেদনে ১৮ থেকে ২৪ মের পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, ওই সাত দিনে আগের সপ্তাহের (১১–১৭ মে) চেয়ে দেশে নিশ্চিত হামের রোগী ২২ শতাংশ কমেছে এবং হামের উপসর্গ থাকা রোগীর সংখ্যা ২ শতাংশ বেড়েছে। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু ৪৫ শতাংশ এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১০ শতাংশ বেড়েছে।
একাধিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত আরও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা। এর মধ্যে আছে—দৈনিক কত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, কোন বয়সী রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, যারা ভর্তি হচ্ছে তারা টিকা পেয়েছে কি না, এক রোগী গড়ে কত দিন হাসপাতালে ভর্তি থাকছে, টিকা পাওয়া কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হচ্ছে কি না ইত্যাদি।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তার গভীর ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি আছে। কোন বয়সের রোগী ভর্তি হচ্ছে, কোন বয়সের রোগী মারা যাচ্ছে, তা জানা যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিছু সংখ্যা দিচ্ছে, কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। আরও বিস্তারিত তথ্য দরকার।’