জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্তে পুশ ইনে ব্যর্থ হয়ে এক ব্যক্তিকে নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিএসএফ। বিজিবির সতর্ক অবস্থান। বুধবার সকালে উপজেলার ধানুয়াকামালপুর সীমান্তে।
জামালপুরের বকশীগঞ্জ সীমান্তে পুশ ইনে ব্যর্থ হয়ে এক ব্যক্তিকে নিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আছে বিএসএফ। বিজিবির সতর্ক অবস্থান। বুধবার সকালে উপজেলার ধানুয়াকামালপুর সীমান্তে।

সীমান্তে ৬৮ স্থানে নিয়ম লঙ্ঘন, দিল্লির কাছে ঢাকার প্রতিবাদ

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামো কার্যক্রমে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ঢাকার পক্ষ থেকে দিল্লিকে জানানো হয়েছে, সীমান্তের ৬৮টি স্থানে নির্মিত বেড়ায় বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম বা বিচ্যুতি রয়েছে। এসব অনিয়ম সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত নতুন ৮৬টি স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শুরু করা যাবে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সপ্তাহে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে পাঠানো এক বার্তায় বলেছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা, সড়ক নির্মাণ বা মেরামত, সীমান্ত পোস্ট বা স্থাপনা নির্মাণ, সেতু, কালভার্ট, বাঁধ বা এ ধরনের প্রতিরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণ।

ভারত থেকে বাংলাদেশের ভেতরে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টার মধ্যে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক চলছে। বাংলাদেশ একে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলেছে।

বাংলাদেশ মনে করে, এসব কার্যক্রম ১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ–ভারত সীমান্ত কর্তৃপক্ষের যৌথ নির্দেশিকা এবং সীমান্ত এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা–সংক্রান্ত বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা ও পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই এসব অনিয়ম সুরাহায় ভারত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে বাংলাদেশ আশা করছে।

দিল্লিতে বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরুর কাছাকাছি সময়ে এই বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বুধবার ছিল বৈঠকের তৃতীয় দিন। এ দিন দুই পক্ষ বৈঠকের সম্মত কার্যবিবরণীর খসড়া চূড়ান্ত করা নিয়ে আলোচনা করে। চার দিনের বৈঠক আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে। তবে এবারের বৈঠকের পর দুই পক্ষ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেবে না; বৈঠক শেষে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

ভারত থেকে বাংলাদেশের ভেতরে লোকজনকে ঠেলে পাঠানোর (পুশ ইন) চেষ্টার মধ্যে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক চলছে। বাংলাদেশ একে অবৈধ, মানবাধিকারবিরোধী ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলেছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, নিজস্ব আইন ও বিদ্যমান প্রক্রিয়া মেনে অবৈধ বিদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার রাতেও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার রহিমপুর সীমান্ত দিয়ে আবার পুশ ইনের চেষ্টা করেছে বিএসএফ। তবে বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামের বাসিন্দাদের সতর্ক অবস্থানের কারণে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। একই স্থান দিয়ে আগেও পুশ ইনের চেষ্টা করেছিল বিএসএফ।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়া ভারত বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়েছে। মোট ৬৮টি স্থানে এমন ঘটনা ঘটেছে। একই স্থানে একাধিক ঘটনাও আছে।

ঢাকার প্রতিবাদ

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতেও সীমান্তে বেড়া নির্মাণের চেষ্টার মতো একই ধরনের কার্যক্রম নিয়ে ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছিল বাংলাদেশ। এবারের বার্তায় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সীমান্তে চিহ্নিত অনিয়মগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে বাংলাদেশের অনুমতি ছাড়া ভারত বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চালিয়েছে। মোট ৬৮টি স্থানে এমন ঘটনা ঘটেছে। একই স্থানে একাধিক ঘটনাও আছে। যেমন ৩৯টি স্থানে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা, ৩৩টি সড়ক নির্মাণ বা মেরামত, ২৭টি পোস্ট বা স্থাপনা নির্মাণ, ২০টি সেতু, কালভার্ট, বাঁধ বা অনুরূপ প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা নির্মাণ এবং ১৮টি অন্যান্য অবকাঠামো বা স্থাপনা-সংক্রান্ত কার্যক্রম।

ভারতের কাছে পাঠানো এবারের আপত্তিতে বাংলাদেশ বলেছে, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা অন্য কোনো সশস্ত্র সদস্যের উপস্থিতি না রাখার নিয়ম থাকলেও বেড়া নির্মাণের পর ওই এলাকায় সশস্ত্র বিএসএফ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফ বা অন্য কোনো সশস্ত্র সদস্যের উপস্থিতি বন্ধ করার কথাও বলেছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের আপত্তিতে আরও বলা হয়েছে, সীমান্তের কাছে নির্ধারিত নকশা অনুসরণ না করে কয়েকটি স্থানে ঢালাই করা তারের জাল ও বুলেটপ্রুফ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আরও দূরে বেড়া নির্মাণের সুযোগ থাকলেও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়াই তা শূন্যরেখার কাছাকাছি করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের অনুমোদন ছাড়া বেড়ার সঙ্গে টহল চৌকি, প্রবেশদ্বার, সিসিটিভি ক্যামেরা ও সার্চলাইট বসানো হয়েছে।

বাংলাদেশের অবস্থান হলো আগে নির্মিত ৬৮টি এবং নির্মাণাধীন ৫টি স্থানে চিহ্নিত বিচ্যুতি সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত কাজ আবার শুরু করা যাবে না। একইভাবে যেসব ৮৬টি স্থানে এখনো কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ শুরু হয়নি, সেসব স্থানে কাজ শুরুর আগে যৌথ পরিদর্শন শেষ করা এবং যৌথ আলোচনার কার্যবিবরণী চূড়ান্ত করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ। শূন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের মধ্যে বিএসএফ বা অন্য কোনো সশস্ত্র সদস্যের উপস্থিতি বন্ধ করার কথাও বলেছে বাংলাদেশ।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে পুশ ইনকে ঘিরে যে লাগাতার উত্তেজনা চলছে, তা এড়িয়ে স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দুই পক্ষের উদ্যোগী হওয়া উচিত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান কাঠামোগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উত্তেজনা পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের বিষয়ে দুই দেশের সচেষ্ট থাকা বাঞ্ছনীয়।