মো. খুরশীদ আলম আমাদের কৈশোরকে রঙিন ও আনন্দময় করে তুলেছিলেন একটার পর একটা জনপ্রিয় গান দিয়ে। সত্তরের দশক ও আশির দশকের প্রথম ভাগে ঢাকার বাইরে টেলিভিশনের তরঙ্গ পৌঁছায়নি। রেডিওই ছিল সবার সারা দিনের সঙ্গী। খবরের জন্য রাত পৌনে আটটায় বিবিসি বাংলা আর বিনোদনের জন্য বেতার। গরমের ছুটিতে আমগাছের নিচে মাদুর পেতে বসে শুনছি গানের ডালি, অনুরোধের আসর, সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে সৈনিক ভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দুর্বার। রেডিওতে খুরশীদ আলমের কণ্ঠে ‘মা গো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলা তুই দিওয়ানা’ বাজতই বাজত। জিঘাংসা ছবির গান, ‘পাখির বাসার মতো দুটি চোখ তোমার, ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন’ শুনে অভিভূত হয়ে যেতাম। তাঁর অগণিত গান মানুষের ঠোঁটে ঠোঁটে আর হৃদয়ে হৃদয়ে বাজত। সেই মানুষটা এখনো প্রাণবন্ত, হাসিখুশি, সদালাপী। আলাপের ফাঁকে যখন গান ধরেন, মনে হয়, কীভাবে পারেন ৮০ পেরিয়ে ৮১-তে এসে এত সুন্দর করে গাইতে!
ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো সাক্ষাৎকার সিরিজের অংশ হিসেবে খুরশীদ আলমের ভিডিও সাক্ষাৎকার নেওয়া ছিল এক আনন্দের অভিজ্ঞতা।
২০২৬ সালের ১ আগস্ট খুরশীদ আলমের ৮০ বছর পূর্ণ হয়েছে। জন্ম ১৯৪৬ সালের ১ আগস্ট, জয়পুরহাটের হারুঞ্জা গ্রামে। তবে শৈশবের বড় অংশ কেটেছে ঢাকায়।
খুরশীদ আলমের পরিবার ছিল শিক্ষিত। তাঁর বাবা এ এফ তসলিম উদ্দিন আহমেদ ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক ছিলেন। দাদা জসীমউদ্দীন আহমেদ ছিলেন ইন্সপেক্টর অব স্কুলস এবং ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক। চার চাচার মধ্যে কেউ ইংরেজির অধ্যাপক, কেউ চিকিৎসক, কেউ আবার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ।
গানের দিকে খুরশীদ আলমের যাত্রাও পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। প্রথমে এক বছর দাদার স্কুল ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে পড়েছিলেন। কিন্তু দাদার শাসন তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি বললেন, ‘ছবি আঁকতে...একটুতেই হাতে মারে।’ তাই দাদিকে বলে স্কুল বদলে চলে এলেন বাবার স্কুল নবাবপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে।
পড়াশোনায় খুব একটা মন ছিল না। নিজের ভাষায়, ‘পড়ালেখায় খুব বেশি ইয়ে ছিলাম না। খালি গান।’
শুরুটা চাচার কাছে
গান শেখার শুরু চাচার কাছেই। মেডিক্যাল কলেজকেন্দ্রিক একটি সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীতে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, পল্লিগীতি, নাচ—সবই চর্চা হতো। তিনি নিয়মিত সেখানে যেতেন। পরে কলেজ অব মিউজিকে ওস্তাদ বারীণ মজুমদারের কাছে পড়েছেন। এরপর জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার চেষ্টা—তবে গানই শেষ পর্যন্ত তাঁকে টেনে নিয়েছে।
১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালে তৎকালীন এডুকেশন উইকে রবীন্দ্রসংগীত ও আধুনিক গানে পরপর সাফল্য পান। তখনো তিনি বাংলাদেশের শিল্পীদের গান খুব একটা জানতেন না। তাঁর নিজের কথায়, ‘সব ভারতীয় শিল্পীদের গান জানতাম এবং প্রচুর গান শুনতাম।’ নিয়মিত শুনতেন রেডিও সিলনের ‘বিনাকা গীতমালা’ এবং আকাশবাণী কলকাতার ‘অনুরোধের আসর’।
১৯৬৬ সালে বাংলাদেশ বেতারে অডিশন দেন। বোর্ডে ছিলেন আবদুল আহাদ, ফেরদৌসী রহমান ও সমর দাস। সমর দাস তাঁর গান শুনে বলেছিলেন, ‘গলা ভালো, কিন্তু একজনকে কপি করে।’ পরে সমর দাসের কাছে ছয় মাস অনুশীলন করেন। খুরশীদ আলম বলেন, ‘ছয় মাস এটা করার পর তারপর উনি বললেন, “এইবার তোকে ছেড়ে দিলাম, ১০ জনের সঙ্গে গাবি, তোর গলা আলাদা হবে।”’
বেতারে আজাদ রহমানের সুরে খুরশীদ আলমের দুটি গান রেকর্ড হয়, ‘তোমার দুহাত ছুঁয়ে শপথ নিলাম’ এবং ‘চঞ্চল দুনয়নে বলো না কী খুঁজছ’। দ্বিতীয় গানটির গীতিকার জেবুন্নেসা জামাল। প্রথমটির গীতিকার কবি সিরাজুল ইসলাম। গান দুটি জনপ্রিয় হয়, পরে পাকিস্তানে ডিস্ক আকারেও প্রকাশিত হয়েছিল।
তারপর ১৯৬৯। চলচ্চিত্রে প্রথম গান। বাবুল চৌধুরীর আগন্তুক। সুর ও সংগীত পরিচালনায় আজাদ রহমান। গান, ‘বন্দী পাখির মতো’।
এই গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নায়করাজ রাজ্জাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও। খুরশীদ আলমের ভাষায়, প্রযোজক গানটি নিয়ে দ্বিধায় পড়লে আজাদ রহমান বলেছিলেন, তাঁকে দিয়ে গানটি না গাওয়ালে তিনি ছবির সংগীত পরিচালক থাকবেন না। শেষ পর্যন্ত রেকর্ডিং হলো। রাজ্জাক তাঁর কণ্ঠে লিপসিং করবেন—এ কথাও তাঁকে জানিয়েছিলেন।
তখনকার রেকর্ডিংয়ের কষ্টের কথাও খুরশীদ আলম মনে রেখেছেন। এসি তো দূরের কথা, রেকর্ডিংয়ের সময় ফ্যানও চলত না। ‘আমি একবার ৮০ বার একটা গান গেয়েছিলাম’, বললেন তিনি। একই মাইক্রোফোনে ডুয়েট রেকর্ড হতো। রাতের রিহার্সাল গড়িয়ে ভোর হয়ে যেত।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। রবিন ঘোষ, সত্য সাহা, আলম খান, আলী হোসেনসহ অনেক সুরকারের সুরে গান গেয়েছেন। তাঁর নিজের হিসাব, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছাড়া বাংলাদেশের প্রায় সব সুরকারের সুরেই গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছে।
একসময় অবশ্য তাঁর কণ্ঠকে দ্রুত লয়ের গানের সঙ্গে বেশি করে মিলিয়ে দেখা শুরু হয়। তিনি বলেন, ‘লোকের একটা ধারণা হয়ে গেল খুরশীদ আলমকে দিয়ে যত লাইট গান গাওয়ানো যায়।’ ‘তবলায় তেরেকেটে তাক’ ধরনের দ্রুতগতির গান থেকে ‘মাগো মা, ওগো মা’র মতো আবেগঘন গান—দুই ধরনের গানেই শ্রোতারা তাঁকে গ্রহণ করেছেন। ‘মাগো মা’ ছিল সমাধি ছবির গান; গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার এবং সুরকার সত্য সাহা।
সরল উপলব্ধি
দীর্ঘ গানের জীবন নিয়ে খুরশীদ আলমের নিজের উপলব্ধি খুব সরল। ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি যে আল্লাহ সবাইকে সব জিনিস দেয় না। আমাকে হয়তো এটা দিছে। এটা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত।’
খুরশীদ আলমের আরেকটি আক্ষেপ শিল্পীদের রয়্যালটি নিয়ে। ‘রয়্যালটি দেওয়া উচিত’, বললেন তিনি। তাঁর মতে, নিয়মিত রয়্যালটি চালু হলে শিল্পীদের জন্য অনুদাননির্ভর ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে আসত। তবে তাঁর নিজের উপলব্ধিতে সমস্যার আরেকটি জায়গা হলো শিল্পীদের ঐক্যের অভাব, ‘আমরা নিজেরা ইউনাইটেড না।’
৮১তম বছরে দাঁড়িয়েও তাঁর চাওয়া খুব সাধারণ—গান গাইতে চান। দর্শকদের উদ্দেশে তাই তাঁর অনুরোধ, ‘আমার শরীর-স্বাস্থ্য যেন ভালো থাকে। আমি সুস্থভাবে যেন গান গাইতে পারি, এটা আল্লাহ পাকের কাছে আমিও চাই, আপনারাও আমার জন্য দোয়া করবেন।’
তারপর খুরশীদ আলম গাইলেন ‘চুমকি চলেছে একা পথে’। যেন ছয় দশকের বেশি সময়ের গানের পথ আবার ফিরে এল এক মুহূর্তে।