কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবন মাত্র ২৩ বছরের। বই লিখে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই চলত কবির সংসার। আর কোনো রোজগারের বন্দোবস্ত তাঁর ছিল না। কবি হিসাবি ছিলেন না। সংসারে টানাটানি লেগেই থাকত।
আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন। তাঁর বই প্রকাশ, গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি, লেখক সম্মানী—এসব ঘিরে রয়েছে আনন্দ ও দুঃখজাগানিয়া অনেক ঘটনা।
নজরুলের প্রথম প্রকাশিত বই ব্যথার দান। গল্পগ্রন্থটি বেরিয়েছিল ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। নজরুলের তখন বয়স ২৩। কলকাতার মেটকাফ প্রেস থেকে ছাপা হওয়া বইটি প্রথম সংস্করণে মুদ্রিত হয়েছিল ১ হাজার ১০০ কপি। ১৪৭ পৃষ্ঠার বইটির দাম ধার্য হয়েছিল দেড় টাকা।
তখনকার দিনে কোনো বই প্রকাশের এক মাসের মধ্যে এক কপি সরকারি দপ্তরে জমা দিতে হতো। তা না হলে প্রকাশকের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা হয়ে যেত। কোনো প্রকাশকই ওই ঝামেলায় যেতে চাইতেন না। বই প্রকাশের এক মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই ঝঞ্ঝাট চুকিয়ে রাখতেন।
নজরুলের অগ্নিবীণা ও যুগবাণী প্রকাশিত হয়েছিল একসঙ্গে, অভিন্ন বছরে। অগ্নিবীণা বের হয় ১৯২২ সালের অক্টোবরে, ওই মেটকাফ প্রেস থেকে। প্রথমবার ছাপা হলো ২ হাজার ২০০ কপি। ৬৬ পৃষ্ঠার বইটির দাম রাখা হলো এক টাকা। আর যুগবাণী ছিল ৯২ পৃষ্ঠার বই। দাম এক টাকাই। যুগবাণীর প্রথম মুদ্রণের হিসাবটি অবশ্য পাওয়া যায় না।
এই দুটি বই প্রকাশ নিয়ে আছে কিছু গল্প। বই দুটির প্রকাশক আর্য পাবলিশিং হাউস। ঠিকানা কলকাতার ওয়েলিংটন স্ট্রিট। এই প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির মালিক ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। আর পরিচালক শরচ্চন্দ্র গুহ, যিনি একসময় বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয় ছিল নজরুলের। তিনিই নজরুলের সব বই প্রকাশের আগ্রহ দেখান। সে অনুযায়ী নজরুল নবযুগ–এ প্রকাশিত লেখাগুলো যুগবাণী নাম দিয়ে শরচ্চন্দ্রকে দিলেন। এরপর তাঁকে দেওয়া হলো অগ্নিবীণার পাণ্ডুলিপি। তবে প্রকাশক অগ্নিবীণাই প্রথমে বাজারে এনেছিলেন। নজরুলের বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি এই কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই হয়তো। লক্ষণীয় হলো, বই দুটির প্রথম মুদ্রণের সময় প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশক হিসেবে নিজেদের নাম ছাপায়নি। কারণ, মামলা-মোকদ্দমার ভয় ছিল। তাই প্রথমবার কলকাতা ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্যে লেন থেকে কাজী নজরুল ইসলাম নিজেই বই দুটির প্রকাশক হলেন। অগ্নিবীণার প্রথম মুদ্রণের সময় প্রচ্ছদের ছবি এঁকে দিয়েছিলেন শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
অগ্নিবীণা প্রথম মুদ্রণের এক বছরের মধ্যেই দ্বিতীয় মুদ্রণ চলে এল। ছাপা হলো দুই হাজার কপি। দাম বাড়িয়ে করা হলো পাঁচ সিকা। বিদ্রোহী কবি তখন কারাগারে।
নজরুলের কবিতার বই বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান বাজেয়াপ্ত করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। তরুণেরা হুমড়ি খেয়ে পড়লেন বই দুটোর জন্য। কিছু ছাপানো ফর্মা এদিক-সেদিক রয়ে গিয়েছিল। তা বাঁধাই হয়ে গোপনে পৌঁছে গেল তরুণদের হাতে। নজরুলের পরিবারও সংকটের সময় দুটো পয়সার মুখ দেখল।
পরে (১৯২৬) নজরুলের সব বই প্রকাশের দায়িত্ব নিল ডিএম লাইব্রেরি, যেটার মালিক ছিলেন গোপালদাস মজুমদার। তিনি নজরুলের ঘনিষ্ঠদের বললেন, সব লেখার প্রকাশক তিনিই হবেন। অন্যদের যেন বই দেওয়া না হয়। আর টাকা তিনি দিয়ে যাবেনই। কিন্তু গোপালদাস কথা রাখলেন না। একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও ডিএম লাইব্রেরি হিসাবপত্তরে আগ্রহ দেখাল না। নজরুল বিষয়টা জানালেন তখনকার নামী সলিসিটর নির্মলচন্দ্রকে। তাঁর অফিস থেকে দেওয়া হলো ডিএম লাইব্রেরিকে চিঠি। উকিলের চিঠি পেয়ে হুঁশ হলো তাদের। কিন্তু নজরুল এ সময় যে ভুলটি করলেন, তা হলো অগ্নিবীণার স্বত্ব বিক্রি করে দিলেন তাদের কাছে। নগদ পেলেন দুই হাজার টাকা, যা দিয়ে মোটরগাড়ি কিনলেন কবি।
নজরুলের বইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে অগ্নিবীণাই। প্রতিটি মুদ্রণে ছাপা হয়েছে ২ হাজার ২০০ কপির কম নয়। গত শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বইটির অন্তত অষ্টাদশ সংস্করণ ছাপা হয়েছে।
১৯৩৯ সালে নজরুল বড় অর্থকষ্টে পড়ে যান। তখন তাঁকে চার হাজার টাকা ধার করতে হয় তৎকালীন বড় সলিসিটর অসীমকৃষ্ণ দত্তের কাছ থেকে। কোনো ধারই বিনা শর্তে হয় না। দুই পক্ষে যে দলিল হলো, তাতে লেখা ছিল, এই টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত গান লিখে গ্রামোফোন কোম্পানির কাছ থেকে নজরুলের যে পাওনা, সেই টাকা সরাসরি অসীমকৃষ্ণই নেবেন। এর দুই বছরের মধ্যে নজরুল মস্তিষ্কের কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন। দেশবাসী আর জানতে পারল না নজরুলের দেনা শোধ হয়েছিল কি না। কিংবা কত টাকা অসীমকৃষ্ণ বেশি নিলেন।
এই দুনিয়ায় সবাই সমান নয়। নজরুলের মরুভাস্কর বইয়ের মুদ্রণস্বত্ব ছিল মনোরঞ্জন চক্রবর্তীর হাতে, যিনি ছিলেন কলকাতার কালিকা টাইপ ফাউন্ড্রির মালিক। নজরুলের পরিবারের দুর্দিনে দরদি মনের পরিচয় দিয়ে তিনি নিজে এই স্বত্ব তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
সূত্র: কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা, মুজফ্ফর আহমদ।