নাপিত খয়রা মাছ। এটি মশার লার্ভা খায় অনেক বেশি
নাপিত খয়রা মাছ। এটি মশার লার্ভা খায় অনেক বেশি

মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল, গাপ্পির চেয়ে কার্যকর দেশি ৩ মাছ

মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে কীটনাশকের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব জৈবিক পদ্ধতি ব্যবহারের সম্ভাবনা দেশীয় তিন প্রজাতির মাছকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা যায়, এই তিন প্রজাতির মাছ গাপ্পির চেয়ে অনেক বেশি মশার লার্ভা খেতে পারে।

দূষিত পানিতেও মাছগুলোকে লার্ভা খেতে দেখা গেছে। শুধু কিউলেক্স মশার লার্ভা নয়, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিসের লার্ভাও অনেক বেশি মাত্রায় খেয়ে ফেলছে দেশি মাছগুলো।

কীটতত্ত্ববিদ ও গবেষকেরা বলছেন, নতুন এ কৌশল শুধু নগরে নয়, দেশের সর্বত্র প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে। এতে বিদেশি মাছের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। আবার নতুন দেশি মাছের প্রয়োগ মাছটির বংশবিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে দেশীয় মাছ কতটা কার্যকর, দূষিত পানিতে তারা টিকে থাকতে পারে কি না এবং অন্য খাবার থাকলে তারা মশার লার্ভা খেতে আগ্রহী থাকে কি না, তা দেখা।
মশা

কীভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার, তাঁর ছাত্র ফারহান চৌধুরীসহ কয়েকজন গবেষক দেশীয় তিন প্রজাতির মাছের সঙ্গে বিদেশি গাপ্পি মাছের লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা তুলনা করেন। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে দেশীয় মাছ কতটা কার্যকর, দূষিত পানিতে তারা টিকে থাকতে পারে কি না এবং অন্য খাবার থাকলে তারা মশার লার্ভা খেতে আগ্রহী থাকে কি না, তা দেখা।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার

মশার লার্ভা ঢাকার সাভার এলাকার বিভিন্ন নর্দমা থেকে সংগ্রহ করা হয়। গবেষণাগারে ও সেমিফিল্ডে পরীক্ষা চালানো হয়। প্রতিটি মাছকে আলাদা পাত্রে রাখা হয়। স্বাভাবিক ও নর্দমার দূষিত—দুই ধরনের পানিতেই মাছের সামনে ১০০টি করে কিউলেক্স মশার তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট লার্ভা গুনে মাছের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

তিন প্রজাতির মাছ কার্যকর

মশা নিয়ন্ত্রণে দুভাবে কীটনাশক ছিটানো হয়

গবেষণারের ফল অনুযায়ী, নাপিত খয়রা দুই ধরনের পানিতেই সবচেয়ে বেশি লার্ভা খেয়েছে। দূষিত পানিতে তার গড় খাদ্য গ্রহণ স্বাভাবিক পানির তুলনায় সামান্য কম হলেও ব্যবধানটি পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। অন্য তিন প্রজাতির ক্ষেত্রেও দুই ধরনের পানিতে লার্ভা খাওয়ার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ পরীক্ষার নির্দিষ্ট পরিবেশে মাছগুলো দূষিত পানিতেও লার্ভা খেতে পেরেছে।

গবেষণায় ব্যবহৃত ১০০টি করে কিউলেক্স মশার তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা ২৪ ঘণ্টা পর গুনে দেখা হয়, মাছগুলো কতটি খেয়েছে। স্বাভাবিক পানিতে নাপিত খয়রা গড়ে ৯৪ দশমিক ৫টি ও দূষিত পানিতে ৯৩ দশমিক ৭৫টি লার্ভা খেয়েছে। জেব্রাফিশের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৮৭ ও ৮৬ দশমিক ২৫। ব্লু পাঞ্চাক্স খেয়েছে ৮০ দশমিক ৭৫ ও ৭৮ দশমিক ৭৫টি। বিদেশি গাপ্পি মাছ স্বাভাবিক পানিতে গড়ে ৫৬ দশমিক ৫টি ও দূষিত পানিতে ৬১ দশমিক ৫টি লার্ভা খেয়েছে।

গবেষক ফারহান চৌধুরী

গবেষক অধ্যাপক কবিরুল বাশার প্রথম আলোকে বলেন , শুধু কিউলেক্স নয়, এডিস খাওয়ানোর পরও দেখা গেছে, নাপিত খয়রাসহ তিনটি মাছই ৯৩ থেকে ৯৪ শতাংশ মশার লার্ভা খেয়ে ফেলেছে।

প্রতিটি মাছকে আলাদা পাত্রে রাখা হয়। স্বাভাবিক ও নর্দমার দূষিত—দুই ধরনের পানিতেই মাছের সামনে ১০০টি করে কিউলেক্স মশার তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা দেওয়া হয়। ২৪ ঘণ্টা পর অবশিষ্ট লার্ভা গুনে মাছের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

অন্য খাবার থাকলেও লার্ভার প্রতি আগ্রহ

গবেষকেরা মশার লার্ভার পাশাপাশি মাছকে অন্য খাবারও দিয়ে দেখেছেন, তারা কোন খাবার বেশি পছন্দ করে। এ পরীক্ষায় মশার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পর্যায়ের লার্ভা, টিউবিফেক্স কৃমি ও কৃত্রিম মাছের খাবার ব্যবহার করা হয়।

নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্স অন্য খাবারের তুলনায় মশার লার্ভার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্লু পাঞ্চাক্সের পছন্দ ছিল তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা। নাপিত খয়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের লার্ভা বেশি পছন্দ করেছে। গাপ্পির ক্ষেত্রে কোনো একটি খাবারের প্রতি স্পষ্ট পছন্দ পাওয়া যায়নি; কৃত্রিম মাছের খাবারের প্রতিও তাদের আগ্রহ ছিল।

দূষিত পানিতে মাছের টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাই করতে ১০ দিন ধরে পরীক্ষা চালানো হয়। চার প্রজাতির সব মাছই এ সময় বেঁচে ছিল। জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সের ওজনও বেড়েছিল। তবে গবেষকেরা লক্ষ করেছেন, দূষিত পানিতে মাছগুলো কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তাই ১০ দিনের পরীক্ষায় বেঁচে থাকার তথ্যকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত সহনশীলতার চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না।

গবেষণার উপসংহারে নাপিত খয়রাকে মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় প্রজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সও কাজে লাগতে পারে বলে গবেষকেরা মনে করছেন। তবে কোন প্রজাতি কোন পরিবেশে ভালো কাজ করবে, তা মাঠপর্যায়ের আরও গবেষণায় নির্ধারণ করতে হবে।

নাপিত খয়রা, জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্স অন্য খাবারের তুলনায় মশার লার্ভার প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্লু পাঞ্চাক্সের পছন্দ ছিল তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা। নাপিত খয়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের লার্ভা বেশি পছন্দ করেছে। গাপ্পির ক্ষেত্রে কোনো একটি খাবারের প্রতি স্পষ্ট পছন্দ পাওয়া যায়নি; কৃত্রিম মাছের খাবারের প্রতিও তাদের আগ্রহ ছিল।

এডিস নিয়ে আলাদা গবেষণায় কী পাওয়া গেছে

এডিস মশা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের আরেকটি গবেষণায় জেব্রাফিশ ও গাপ্পির লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা তুলনা করা হয়েছে। গবেষণাটি ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পরীক্ষাগারে করা হয়। ১০০টি এডিসের তৃতীয় পর্যায়ের লার্ভা দিয়ে ২৪ ঘণ্টা পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।

ওই গবেষণায় জেব্রাফিশ গড়ে ৬৩ দশমিক ৬৭টি লার্ভা খেয়েছিল অর্থাৎ দেওয়া লার্ভার প্রায় ৬৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গাপ্পি খেয়েছিল গড়ে ৩৩ দশমিক ৩৩টি। গবেষকেরা দেখেছেন, অন্য খাবার থাকলেও জেব্রাফিশ এডিসের দ্বিতীয় পর্যায়ের লার্ভা ও পিউপার প্রতি গাপ্পির চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছে। গবেষণাটির উপসংহারে বলা হয়েছে, এডিস নিয়ন্ত্রণে গাপ্পির বিকল্প হিসেবে জেব্রাফিশকে আরও যাচাই করা যেতে পারে। এ গবেষণায় নাপিত খয়রা, ব্লু পাঞ্চাক্স বা কিউলেক্সের কথা নেই।

নতুন গবেষণার ফল বলছে, লার্ভা খাওয়ার পরীক্ষায় কয়েকটি দেশীয় মাছ গাপ্পির চেয়ে ভালো করেছে। দেশীয় প্রজাতি ব্যবহার করলে বিদেশি প্রজাতি স্থানীয় জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য ঝুঁকিও কমানো যেতে পারে।

কীটনাশকের বিকল্প নয়, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অংশ

ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ফাইলেরিয়াসহ নানা রোগ মশার মাধ্যমে ছড়ায়। মশা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে মশার মধ্যে কীটনাশক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। পরিবেশ, মানুষ ও অন্য প্রাণীর ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে মশার লার্ভা খায়—এমন মাছকে জৈবিক নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

লার্ভা থাকার জায়গায় মাছ পৌঁছাতে পারে কি না, সেখানে মাছ কত দিন বাঁচবে, অন্য খাবারের উপস্থিতিতে তারা লার্ভা খাওয়া চালিয়ে যাবে কি না এবং তাদের প্রজনন কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মাঠপর্যায়ে খুঁজতে হবে।

বাংলাদেশে আগে মশা নিয়ন্ত্রণে বিদেশি গাপ্পি মাছ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়ও গাপ্পি মাছ ছাড়ার উদ্যোগ শুরু হয়। তবে সেটি খুব সফল হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা। নতুন গবেষণার ফল বলছে, লার্ভা খাওয়ার পরীক্ষায় কয়েকটি দেশীয় মাছ গাপ্পির চেয়ে ভালো করেছে। দেশীয় প্রজাতি ব্যবহার করলে বিদেশি প্রজাতি স্থানীয় জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য ঝুঁকিও কমানো যেতে পারে। গবেষণার আলোচনায় অন্য দেশে বিদেশি মশাখেকো মাছ অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পরিবেশগত সমস্যা তৈরির উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

তবে মাছ ছাড়লেই মশার সমস্যা মিটে যাবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। লার্ভা থাকার জায়গায় মাছ পৌঁছাতে পারে কি না, সেখানে মাছ কত দিন বাঁচবে, অন্য খাবারের উপস্থিতিতে তারা লার্ভা খাওয়া চালিয়ে যাবে কি না এবং তাদের প্রজনন কীভাবে হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর মাঠপর্যায়ে খুঁজতে হবে। নর্দমা বা জলাশয়ের পানির গুণাগুণ, অক্সিজেন, প্রবাহ ও অন্যান্য প্রাণীর উপস্থিতিও ফলকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডেঙ্গুর চাপ বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে

মশা নিয়ন্ত্রণের নতুন উপায় খোঁজার পটভূমিতে এ বছর দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৬৭। এ সময়ে মারা গেছেন ৪১৮ জন। গত বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৪১৩ জন। অর্থাৎ ২০২৬ সালের অক্টোবর শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা—দুটিই গত বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়েছে।

এর আগের বছর, ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সে বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং মারা গিয়েছিলেন ১ হাজার ৭০৫ জন।

ডেঙ্গুর মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা মারার দিকে নজর দিলে হবে না; লার্ভা জন্মানোর জায়গাও কমাতে হবে। জমে থাকা পানি, ফেলে রাখা পাত্র, ড্রাম ও পানির ট্যাংকসহ সম্ভাব্য প্রজননস্থল নিয়মিত খুঁজে দেখা এবং পানি সরানো জরুরি। মাছ ব্যবহারের গবেষণা এই বৃহত্তর ব্যবস্থাপনার একটি সম্ভাব্য দিক দেখায়। এটি নিজে থেকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের পূর্ণ সমাধান নয়।

নতুন গবেষণায় কিছু মাছ এডিসের লার্ভা খেতে পারে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে পানি ধরে রাখা পাত্রে এসব মাছ ব্যবহার করে এডিস নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর মতে, জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস নিয়ন্ত্রণে মানুষের অংশগ্রহণের ঘাটতিই বড় সমস্যা।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

মাছ দিয়ে মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা নতুন নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০২২ সালে গাপ্পি মাছ দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের গবেষণায় গাপ্পি মাছ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ লার্ভা খেয়েছিল। বহু দেশে এ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

তৌহিদ উদ্দিন আহমেদের মতে, গাপ্পি মাছের ব্যবহার সব জায়গায় সমান ফল দেয়নি। নালা বা নর্দমার মতো পরিবেশে মাছ রাখা কঠিন। তাঁদের আগের গবেষণায় শুধু কিউলেক্স মশার লার্ভা নিয়ে কাজ হয়েছিল, এডিসের ক্ষেত্রে নয়। তবে চৌবাচ্চা ও ড্রামে গাপ্পি মাছ কার্যকর হতে পারে বলে তাঁরা দেখেছিলেন।

চলতি বছর উপকূলীয় এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। সেখানে জমিয়ে রাখা বৃষ্টির পানিতে এডিসের বংশবিস্তারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়ও ড্রামে পানি ধরে রাখা হয়। এ প্রসঙ্গে তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, নতুন গবেষণায় কিছু মাছ এডিসের লার্ভা খেতে পারে—এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে পানি ধরে রাখা পাত্রে এসব মাছ ব্যবহার করে এডিস নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে তাঁর মতে, জনসাধারণের অংশগ্রহণ ছাড়া এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস নিয়ন্ত্রণে মানুষের অংশগ্রহণের ঘাটতিই বড় সমস্যা।

মৎস্যবিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণায় থাকা তিনটি দেশি মাছের সব কটিই প্রকৃতিতে এখন সমানভাবে সহজলভ্য নয়। মৎস্যবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় নালাযুক্ত ধানখেতে জেব্রাফিশ বা আঞ্জু, যাকে ঝিয়া মাছও বলা হয়। এটি তুলনামূলকভাবে বেশি পাওয়া যায়। গবেষণায় থাকা আরেকটি মাছ ব্লু পাঞ্চাক্স, স্থানীয়ভাবে তিন চোখা নামে পরিচিত। গ্রামাঞ্চলে আগে মাছটি বেশি পাওয়া গেলেও এখন ততটা দেখা যায় না। মশা নিয়ন্ত্রণে এর উৎপাদন বাড়ানো গেলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

অধ্যাপক আবদুল ওহাব বলেন, নাপিত খয়রা কিছুটা সম্ভ্রান্ত মাছ হিসেবে পরিচিত। শহরের নর্দমায় এ মাছ কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা নিয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে পরিষ্কার পানি, চৌবাচ্চা ও ড্রামের স্বচ্ছ পানিতে মাছটি থাকতে পারে এবং সেখানে মশার লার্ভা খেতে পারে। দেশি মাছের লার্ভা খাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে তাঁর সন্দেহ নেই, তবে কোন মাছ কোন পরিবেশে কার্যকর হবে, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন।

মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা জরুরি

গবেষণাগারে কোনো মাছ বেশি লার্ভা খেয়েছে বলে বাস্তব নর্দমা বা জলাশয়েও একই ফল হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গবেষণার ফলকে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করার আগে বিভিন্ন ধরনের নর্দমা ও জলাশয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা দরকার। সেখানে মাছের বেঁচে থাকা ও প্রজনন, পানির গুণমান, লার্ভা কমার হার এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর প্রভাব দেখতে হবে।

গবেষকেরা নাপিত খয়রাকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বলেছেন। জেব্রাফিশ ও ব্লু পাঞ্চাক্সও সম্ভাব্য জৈবিক নিয়ন্ত্রণের উপাদান হতে পারে। তবে এদের ব্যবহার নির্ধারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ তৌহিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে দেশি মাছের ব্যবহার কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে।