
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট একসঙ্গে প্রকট হয়ে ওঠায় দেশজুড়ে জনজীবনে দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানা, পরিবহন, সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব পড়েছে। একই সঙ্গে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নামে বিভিন্ন মন্তব্য ছড়িয়ে পড়ছে। যাচাইয়ে দেখা গেছে, এসব বক্তব্যের কোনো কোনোটি ব্যঙ্গাত্মক ও প্যারোডি পেজে তৈরি হলেও পরে তা প্রকৃত মন্তব্য হিসেবে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও প্রোফাইলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে উদ্ধৃত করে ‘আমাদের ছোটবেলায় তো বিদ্যুৎই ছিলো না। তখন কি আমরা বাঁচি নাই? আর এখন মাত্র ১৬/১৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে আপনারা সরকারকে গালাগালি করেন’—এমন একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
দাবিটির সত্যতা যাচাই করে বিদ্যুৎমন্ত্রীর এমন কোনো বক্তব্য বিশ্বস্ত গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। মন্ত্রীর ফেসবুক পেজ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোও পর্যালোচনা করা হয়। কোথাও ভাইরাল ফটোকার্ডে থাকা বক্তব্যটি পাওয়া যায়নি।
ফটোকার্ডটির সূত্রপাতের বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘Gupto Tv’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ১২ আগস্ট ফটোকার্ডটি প্রকাশ করা হয়।
লিংক: এখানে
পেজের পরিচিতিতে নিজেদের ‘Satire & Parody platform’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাদের সব কনটেন্ট বিনোদনের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গ ও প্যারোডির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। পেজে একই ধরনের আরও অনেক ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট পাওয়া যায়। ফলে ফটোকার্ডটি কোনো সংবাদ প্রতিবেদন বা মন্ত্রীর প্রকৃত বক্তব্য হিসেবে প্রকাশ করা হয়নি বলেই প্রতীয়মান হয়।
একই ব্যঙ্গাত্মক পেজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি ব্যবহার করে ১২ আগস্ট আরেকটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে লেখা হয়, ‘চাইলেই ২৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ দিতে পারি, কিন্তু মায়ের সম্মানার্থে দিচ্ছি না—মায়ের আমলে ৩ ঘণ্টার বেশি কারেন্ট ছিল না, সন্তান হিসেবে মাকে টপকে যাওয়া অনৈতিক।’
লিংক: এখানে
ফটোকার্ডের সত্যতা যাচাইয়ে বক্তব্যর ও প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করে প্রধানমন্ত্রীর এমন কোনো মন্তব্য গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ফেসবুক পেজ, বিএনপির মিডিয়া সেলসহ সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলোতেও এমন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একই পেজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির নবনিযুক্ত সদস্য রুহুল কবির রিজভীকে উদ্ধৃত করে ১১ আগস্ট একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। ফটোকার্ডে রিজভীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘এই যে কম বিদ্যুৎ থাকে, এরও কিন্তু একটা ভালো দিক আছে। বিদ্যুৎ কম থাকার কারণে বিদ্যুৎ বিলও কম আসবে।’
লিংক: এখানে
অনুসন্ধানে রুহুল কবির রিজভী এমন কোনো মন্তব্য করেছেন—এমন তথ্য গণমাধ্যম বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে উদ্ধৃত করে আরও একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার সমস্যা সমাধান হয়েছে। এখনো যারা বিল বেশি আসছে বলে দাবি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে গণমাধ্যম ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে অনুসন্ধান করে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর এমন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ফটোকার্ডটি ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ৩ আগস্ট প্রকাশিত হতে দেখা যায়।
লিংক: এখানে
পেজটির পরিচিতিতে ‘স্যাটায়ার এবং প্যারোডি’ উল্লেখ রয়েছে। একই পেজে আরও অনেক ব্যঙ্গাত্মক পোস্টও পাওয়া যায়।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে উদ্ধৃত করে আরও একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, ‘শেখ হাসিনা ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছিল বলেই আজ এত লোডশেডিং! জনগণকে কষ্ট দিতেই ফ্যাসিস্ট সরকার এই “অপরাধ” করে গেছে।’
তবে অনুসন্ধানে বিদ্যুৎমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি। কোনো সংবাদমাধ্যমেও এ ধরনের বক্তব্য প্রকাশিত হওয়ার তথ্য মেলেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্ধৃত করে আরেকটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, ‘আমার এখানে বিদ্যুৎ আছে। গ্যাসও আছে। গাড়িতে তেল আছে। বাসায় নিয়মিত বাজার আছে। যারা বলছেন, এই নাই, সেই নাই—তারা ফ্যাসিস্টদের দোসর। আমি সজাগ আছি। আপনাকেও সজাগ থাকতে হবে।’
অনুসন্ধান করে প্রধানমন্ত্রীর এমন কোনো বক্তব্য বিশ্বস্ত গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে পাওয়া যায়নি। তারেক রহমানের ফেসবুক পেজ, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোও পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোথাও ভাইরাল ফটোকার্ডের বক্তব্যটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
চলমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করলে তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার কথা। বরং সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকট নিয়ে তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্যে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। এসব বক্তব্যে তিনি দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস–সংকটের কথা স্বীকার করেছেন এবং সংকট সমাধানে সরকারের উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন।