
বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা যাতে হারিয়ে না যায়, তাই ভাষাগুলোর বর্ণমালা ও বানানরীতি তৈরি করছে সিল।
‘তিনটিকিয়া’ ভাষার বর্ণমালা ছিল না। কোচদের ভয় ছিল, তাদের এই ভাষা বুঝি হারিয়ে যাবে। সেই ভীতি অমূলক ছিল না হয়তো। কারণ, নতুন প্রজন্মের মধ্যে নিজ ভাষার ব্যবহার অনেকটাই কমে যাচ্ছিল। সেটা অনুভব করতেন অমৃত কোচের মতো অনেকেই। তাঁর বাড়ি শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার শালচোরা গ্রামে। এখানে ২৮ কোচ পরিবারের বাস। আশপাশের তিন-চারটি গ্রামও কোচ সংখ্যাগরিষ্ঠ। অমৃত কোচ বলছিলেন, ‘একটি বর্ণমালার দরকার ছিল। সেই বর্ণমালা এখন পেয়েছি। হয়তো এটা আমাদের ভাষার সুরক্ষায় কাজ করবে।’
বাংলাদেশে যে ৫০টির বেশি জনজাতিগোষ্ঠী আছে, তাদের মধ্যে কোচ একটি। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, কোচদের সংখ্যা ১৩ হাজার ৭০২। এত কম সংখ্যায় মানুষের ভাষা বিপন্ন প্রায়। শুধু কোচদের নয়, বাংলাদেশে ৫০টির বেশি নৃগোষ্ঠীর প্রতিটির ভাষাই বিপন্ন। সংখ্যায় যারা বেশি যেমন চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা সান্তাল—তাদের ভাষা হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা কম। কিন্তু কোচদের মতো জনসংখ্যার বিচারে ছোট জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি অনেকটাই বেশি। এসব ভাষা একেবারে যাতে হারিয়ে না যায়, তাই ভাষাগুলোর বর্ণমালা ও বানানরীতি তৈরি করছে আন্তর্জাতিক সংগঠন সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকস (এসআইএল)। এ পর্যন্ত নয়টি ভাষার ক্ষেত্রে কাজ করেছে তারা। সেগুলো হলো কোল, কোডা, মাহালী, কুঁড়ুক্ষ, মাল পাহাড়িয়া, কোচ, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ও উসই ত্রিপুরা।
বর্ণমালা তৈরির পাশাপাশি ‘ভাষা শিখন’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে সংস্থাটি।
এসআইএল ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কর্নেলিয়াস টুডু বলেন, ‘যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন হারিয়ে যায় এক বৈচিত্র্যময় জগৎ। গল্পগুলো আর বলা হয় না, পৃথিবীকে দেখার এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আমরা হারিয়ে যাওয়া রোধ করতে চাই।’
এসআইএল বাংলাদেশ কোনো ভাষার অবস্থানকে জানার জন্য এক্সপান্ডেড গ্রেডেড ইন্টিগ্রেশনাল ডিসরাপশন স্কেল (ইজিআইডিএস) মানদণ্ড ব্যবহার করে। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, দেশের প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর ভাষা ঝুঁকির মধ্যে।
প্রতিটি বানানরীতি এবং বর্ণমালা তৈরির প্রক্রিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েই করে এসআইএল। প্রথমে এসব জাতিগোষ্ঠীর লিখিত দলিল বা সাহিত্যের সন্ধান করে তারা। এসব না পাওয়া গেলে বোঝা যায়, তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট হরফ নেই। এরপর হরফ ঠিক করা হয়।
কোল, কোডা, মাহালী, কুঁড়ুক্ষ, মাল পাহাড়িয়া, কোচ, হাজং, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, উসই ত্রিপুরা ভাষা নিয়ে চলছে কাজ।
এসআইএলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (ভাষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ) স্কলাসটিকা শেফালি রিবেরু বলেন, জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয় তারা কোন হরফ বেছে নেবে। এখানে চাপিয়ে দেওয়ার কিছু নেই।
গল্প লিখন, বাক্য লিখন, দলগত আলোচনা এরূপ বিভিন্ন উপায়ে এই বানানরীতি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। বানানরীতির খসড়া এসব জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে তুলে ধরে সেগুলোর চূড়ান্ত করা হয়।
শুধু বর্ণমালা তৈরি করেই থেমে থাকেনি সংস্থাটি। তারা ‘ভাষা শিখন’ নামে একটি কর্মসূচি চালু করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ভাষাগোষ্ঠীর মানুষকে তাদের নিজস্ব ভাষার ধ্বনির সঙ্গে পরিচিত করা এবং সেই ধ্বনি থেকে শব্দ ও বাক্য গঠনের কৌশল শেখানো।
প্রাথমিক পর্যায়ে কুঁড়ুক্ষ ও কোচ ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে এই কর্মসূচি পরিচালিত হয়েছে। এতে ৪০০-এর বেশি তরুণ-তরুণী ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজেদের মাতৃভাষায় পড়া ও লেখার দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেয়েছেন। শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমও চালাচ্ছে এসআইএল।
ওরাঁওদের ভাষা কুঁড়ুক্ষ। রংপুরের মিঠাপুকুরের এই জাতিগোষ্ঠীর নির্মলা কুজুর বলছিলেন, ‘আমার আর নিজের ভাষা হারানোর কোনো ভয় নেই। নতুন প্রজন্ম অন্তত ভাষাটি হারাবে না।’
প্রতিটি বানানরীতি এবং বর্ণমালা তৈরির প্রক্রিয়া ভাষাগোষ্ঠীর মানুষদের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েই করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান সিলের কাজটিকে ‘খুবই তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ভাষার লিখিত রূপ বা বর্ণমালা না থাকলে মুখে মুখে তা বেশি দিন টিকতে পারে না। আর যেসব শিশু নিজের ভাষায় ছোটবেলায় শিখতে পায়, তাদের লেখাপড়ার মান ভালো হয়, এটা গবেষণায় প্রমাণিত।
বেসরকারি এই উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে বিপন্ন ভাষার বর্ণমালা বা বানানরীতি তৈরির উদ্যোগে নেওয়া দরকার বলেও মনে করেন তিনি।