আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

ছাত্রদল-জাসাসের দুজনকে ক্রসফায়ার দেওয়ায় সাবেক দুই এএসআই টাকা পুরস্কার পান, জবানবন্দিতে পুলিশ কর্মকর্তা

২০১৫ সালে বরিশালে ছাত্রদল ও জাসাসের দুজন নেতাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করায় উজিরপুর থানার তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিনকে ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছেন মো.আলী আহম্মেদ। আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ দেওয়া জবানবন্দিতে এ কথা উল্লেখ করেছেন সাক্ষী আলী আহম্মেদ।

ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ক্রসফায়ার দেওয়ার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আলী আহম্মেদ আজ জবানবন্দি দেন। তিনি বরিশালের উজিরপুর থানায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের দিন তিনি উজিরপুর থানার সেকেন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বরিশাল মহানগর সিআইডিতে পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।

২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলা ছাত্রদলের তৎকালীন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার এবং একই উপজেলার জাসাসের সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লাকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়।

আজকের জবানবন্দিতে আলী আহম্মেদ বলেন, ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে বরিশালের তৎকালীন পুলিশ সুপার এ কে এম এহসানউল্লাহ উজিরপুর থানায় এসে থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলামের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ মিনিট কথা বলে চলে যান। এরপর ওসি তাঁকে ডেকে বলেন, ‘অন্য থানায় কর্মরত এএসআই জসিম উদ্দিন এবং এএসআই মাহবুলকে থানা এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার জন্য সিসি (কমান্ড সার্টিফিকেট বা দায়িত্বপত্র) দাও। তারা এসপির নির্দেশনা অনুযায়ী ডিউটি করবেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকবেন।’

আলী আহম্মেদ বলেন, তখন তিনি কর্তব্যরত কর্মকর্তাকে (ডিউটি অফিসার) ডেকে ওসির নির্দেশনা শোনান। সেই এএসআই জসিম উদ্দিন ও এএসআই মাহবুলকে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিসি দিতে বলেন। এরপর দাপ্তরিক কার্যক্রম শেষে তিনি বাসায় চলে যান।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে টেলিভিশনে দেখেন পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়া থানা এলাকায় টিপু হাওলাদার ও কবির মোল্লা নামের দুজন লোক পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আলী আহম্মেদ। তিনি বলেন, সেদিন বিকেলে তিনি থানায় গেলে ওসি তাঁকে ডেকে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিমকে আগামী ১০ দিন কোনো ডিউটি না দেওয়ার জন্য বলেন। নির্দেশনা মোতাবেক তাদের ডিউটি দেওয়া থেকে বিরত রাখেন তিনি।

আলী আহম্মেদ বলেন, এরপর কর্মকর্তা ও ফোর্সদের মধ্যে কানাঘুষা চলতে থাকে, আগৈলঝাড়া থানার ক্রসফায়ারের ঘটনা এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম ঘটিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন, এসপি সাহেবের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে ওই দুজন উক্ত ঘটনা ঘটিয়েছেন। ১০ দিন পরে এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম থানায় আসেন এবং তাঁদের কথাবার্তা অসংলগ্ন ছিল। তাঁদের চালচলনও অস্বাভাবিক ছিল।

পরে এই দুই এএসআই ওসিকে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন ছুটির প্রয়োজনের কথা জানান বলে উল্লেখ করেন আলী আহম্মেদ। তিনি বলেন, তখন অফিসার ইনচার্জ তাঁদের আরও ১০ থেকে ১৫ দিন ডিউটি থেকে বিরত রাখার জন্য তাঁকে বলেন। তিনি তাঁদের আরও ১০ থেকে ১৫ দিন ডিউটি থেকে বিরত রাখেন।

এএসআই মাহাবুল ও এএসআই জসিম অত্যন্ত বেপরোয়া ছিলেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন আলী আহম্মেদ। তিনি বলেন, এই দুজনকে দায়িত্ব দিলে তৎকালীন সংসদ সদস্য (এমপি) আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও এসপির রেফারেন্স দিয়ে অন্যদিকে চলে যেতেন। ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন না। তাঁদের ভয়ে অন্য কর্মকর্তারা ও ফোর্সরা ঠিকভাবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতেন না। তাঁরা সব সময় এসপির রেফারেন্সে চলতেন। তৎকালীন সরকারের আমলে বরিশাল জেলায় আরও চার থেকে পাঁচটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে এ রকমের অসংখ্য বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

এ মামলায় চারজন আসামি। এর মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং বরিশালের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসানউল্লাহ পলাতক। অপর দুই আসামি বরিশালের উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও মো. জসিম উদ্দিন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।