
বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে যে নাট্যজনেরা তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছেন, আতাউর রহমান ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তিনি একাধারে ছিলেন অভিনেতা, নির্দেশক, সংগঠক। থিয়েটারের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। সম্মানিত ছিলেন ‘মঞ্চসারথি’ অভিধায়। জীবনের অমোঘ নিয়মে পৃথিবীর মঞ্চ ছেড়ে গেলেও সহযাত্রীরা তাঁকে স্মরণে রেখেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ১৮ জুন ছিল তাঁর ৮৫তম জন্মদিন। সেমিনার, সংগীত, আবৃত্তি আর তাঁরই নির্দেশিত নাটকের অংশ দিয়ে সাজানো অনুষ্ঠানে উদ্যাপিত হলো তাঁর জন্মদিন।
মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে সন্ধ্যায় আতাউর রহমানের ৮৫তম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল মঞ্চসারথি আতাউর রহমান কর্ম উদ্যাপন পর্ষদ। অনুষ্ঠানের প্রথমেই ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পালাকারের প্রযোজনা বাংলার মাটি বাংলার জল–এর অংশবিশেষ অভিনয় করেন দীপ্তা রক্ষিত, পালাকারের আরেকটি প্রযোজনা নারীগণ নাটকের অংশবিশেষ অভিনয় করেন জয়িতা মহলানবীশ এবং নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের প্রযোজনায় ঈর্ষা নাটকের অংশবিশেষ অভিনয় করেন পান্থ শাহরিয়ার। এ তিনটি নাটকেরই নির্দেশনা দিয়েছেন আতাউর রহমান ও রচনা করেছেন সৈয়দ শামসুল হক।
নাসিরুল হকের সঞ্চালনায় এই পর্বে আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও নায়লা তারান্নুম। সংগীত পরিবেশন করেন নির্ঝর চৌধুরী।
পরে ছিল সেমিনার। ‘নাট্যনির্দেশনায় আতাউর রহমানের অন্তর্দৃষ্টি’ বিষয়ে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আহমেদুল কবির। তিনি বলেন, আতাউর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্য নির্দেশনার ক্ষেত্রে নতুন ধারার প্রবর্তক বলে বিবেচিত। যার সামনে থিয়েটার দর্শকদের অভিভূত বিস্ময়ে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য পথ থাকে না।
আমিনুর রহমানের সঞ্চালনায় এই পর্বে পরে আলোচনায় অংশ নেন প্রাবন্ধিক মফিদুল হক, নাট্যজন নাসীরউদ্দীন ইউসুফ, আবদুস সেলিম প্রমুখ। আতাউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ১৮ জুন নোয়াখালীতে। আলোচকেরা বলেন, তিনি এমন এক সময় বেড়ে উঠেছিলেন, যখন পূর্ব বাংলার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ক্রমে রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। ভাষা আন্দোলনের অভিঘাত, পাকিস্তান পর্বের সাংস্কৃতিক সংকট এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ তার শিল্পসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রের সামনে যখন সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের প্রশ্ন আসে, তখন তিনি বিশ্বাস করেছিলেন মঞ্চ কেবল বিনোদনের জায়গা নয়, এটি মানুষের চিন্তা বদলে দেওয়ারও শক্তি রাখে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বাংলাদেশের আধুনিক মঞ্চ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।
নাটকে অবদানের জন্য আতাউর রহমান রাষ্ট্রীয় একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। গত ১২ মে আতাউর রহমান চলে যান না ফেরার দেশে।
অকালপ্রয়াত কবি শামীম কবীরকে নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশনা অনুষ্ঠান হলো গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্র মিলনায়তনে। এতে ছিল কবির কবিতা নিয়ে আলোচনা ও স্মৃতিচারণা।
নব্বই দশকের এই কবিকে নিয়ে ‘শামীম কবির: স্মরণ ও পাঠ’ নামের গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে পুণ্ড্র প্রকাশন। সম্পাদনা করেছেন নভেরা হোসেন। ‘সংস্কৃতি বাংলা’ আয়োজিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ। সম্পাদকের বক্তব্য দেন নভেরা হোসেন। আলোচনায় অংশ নেন কুমার চক্রবর্তী, চঞ্চল আশরাফ, শোয়েব শাহরিয়ার, পিয়াস মজিদ ও আফরোজা সোমা। পরিবারের পক্ষ থেকে স্মৃতিচারণা করেন কবির অনুজ লতিফুল বারী। সভাপ্রধান ছিলেন কবি ও অনুবাদক গৌরাঙ্গ মোহান্ত।
আলোচকেরা বলেন, শামীম কবীর বাংলাদেশের কবিতায় এক উজ্জ্বল নাম। অকালমৃত্যু তাঁর পূর্ণ প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেয়নি; কিন্তু মৃত্যুর পর প্রকাশিত তাঁর রচনাসমগ্রে এক প্রতিভাদীপ্ত সৃজনশীল সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।
বক্তারা বলেন, শামীম কবীরের কবিতায় মানুষের অস্তিত্বের নিগূঢ় সংবাদ যেমন উদ্ভাসিত হয়েছে, তেমনি জীবনের ক্লেদ ও গ্লানি উঠে এসেছে। মৃত্যুকে তিনি নানারূপে কবিতায় উদ্যাপন করলেও শেষ পর্যন্ত জীবনেরই গান গেয়ে গেছেন। তাঁর কবিতা তাই তরুণ কবিতাকর্মী, পাঠক-গবেষকদের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে আছে।