অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি বলে জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনকারী এ দলটি বলেছে, চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটেছে।
আজ বৃহস্পতিবার সদ্যবিদায়ী ২০২৫ সালের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলে জেএসএস। আজ প্রতিবেদনটি গণমাধ্যমে পাঠায় পার্বত্য এলাকার এই আঞ্চলিক দলটি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি
জেএসএস বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ১২ জানুয়ারি (২০২৫) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির আহ্বাহক হিসেবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এবং ২৮ আগস্ট ২০২৫ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মুহাম্মদ আবদুল হাফিজকে নিয়োগ দিয়েছে। এ ছাড়া ২০ জানুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ১৯ জুলাই ২০২৫ রাঙামাটিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটির একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর প্রায় ছয় মাস চলে গেলেও সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি নেই।
জেএসএস বলেছে, ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর গত ১৯ অক্টোবর ২০২৫ কমিশনের সভা আহ্বান করা হয়। বাঙালিদের ছাত্র সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের (পিসিসিপি) হরতালের হুমকিতে কমিশনের উক্ত সভাটি স্থগিত করা হয়। অনুরূপভাবে গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনসংক্রান্ত টাস্কফোর্সের ১২তম সভা আহ্বান করা হলে হুমকিতে সেই সভাও স্থগিত করা হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি
জেএসএস বলেছে, ২০২৫ সালে ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। এসব ঘটনায় ৬০৬ জন পাহাড়ি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে ৮ পাহাড়ি নাগরিক বিচারবহির্ভূত হত্যা, ১১৭ পাহাড়ি গ্রেপ্তার, ২টি বৌদ্ধ মন্দিরসহ ৪৩টি বাড়িতে তল্লাশি, ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগণের ওপর ব্যাপক আকারে দুটি নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া ৩০০ একর ভূমি বেদখল করা হয়েছে।
জেএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান না করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নীতি অনুসরণ করে চলেছে। জনসংহতি সমিতিসহ চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনরত সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’, ‘অবৈধ অস্ত্রধারী’ হিসেবে তকমা দিয়ে ক্রিমিনালাইজ করা, মিথ্যা মামলা দায়ের করা, গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো, অমানুষিক মারধর ও হয়রানি, বিচারবহির্ভূত হত্যা ইত্যাদি দমন-পীড়ন অব্যাহতভাবে চলছে।
জেএসএসের সহ–তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা এ প্রতিবেদন পাঠান।