রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া এসি, নন–এসি প্রায় সব বাসে বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা যাচ্ছে
রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া এসি, নন–এসি প্রায় সব বাসে বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা যাচ্ছে

বাসের ভাড়া: ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পঞ্চগড়-দেশের কোন দূরত্বে কত টাকা বাড়ল

বাসে ঢাকা থেকে উত্তরের পথে সবচেয়ে দূরের যাত্রা পঞ্চগড়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তালিকা অনুযায়ী, দূরত্ব ৪৩৮ কিলোমিটার। ভাড়া বৃদ্ধির পর এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ১১৩ টাকা বেড়েছে। ঢাকা থেকে ৪০ আসনের বাসে পঞ্চগড়ের ভাড়া হবে ১ হাজার ৩৭৬ টাকা। আগে এই পথের ভাড়া ছিল ১ হাজার ২৬৩ টাকা।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর সরকার গত মঙ্গলবার দূরপাল্লার এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে। নতুন ভাড়া যুক্ত করে আজ বৃহস্পতিবার ভাড়ার তালিকা প্রকাশ করেছে বিআরটিএ।

অবশ্য গত রোববার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই দূরপাল্লার বাসে দূরত্বভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন পরিবহনমালিক ও শ্রমিকেরা।

নতুন ভাড়ার হার অনুযায়ী, দূরপাল্লার পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া যাত্রীপ্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪০ পয়সা। সে হিসাবে পঞ্চগড় পর্যন্ত যমুনা সেতুর টোলসহ ৫১ আসনের ভাড়া হওয়ার কথা ১ হাজার ৮৬ টাকা। কিন্তু দূরের পথে অধিকাংশ কোম্পানি তাদের বাসে আসন কমিয়ে ৪০—এ নামিয়ে আরামদায়ক করেছে। এসব বাসে ভাড়া বেশি। কারণ, বাদ দেওয়া আসনগুলোর ভাড়া অন্যান্য যাত্রীর ওপর ভাগ করে দেওয়া হয়।

এ ছাড়া দূরপাল্লার পথে চলাচলকারী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে দেয় না। এসি বাসের মালিকেরা নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করেন। ফলে একই দূরত্বে একেক কোম্পানির এসি বাসের ভাড়া ভিন্ন ভিন্ন হয়। মূলত কোম্পানির সুনাম, বাসের মান এবং সেবার ওপর ভিত্তি করে এসি বাসের ভাড়ার তারতম্য হয়।

উত্তরের পথে ঢাকা থেকে বগুড়ার দূরত্ব ১৯১ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসে ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ টাকা। এই পথে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২০ টাকা। আগে এই পথের ভাড়া ছিল ৫৭০ টাকা। ৫১ আসনের বাসে বগুড়ার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮৬ টাকা।

ঢাকা থেকে রাজশাহীর দূরত্ব ২৪৭ কিলোমিটার। নতুন ভাড়া হার অনুযায়ী ৪০ আসনের বাসে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯২ টাকা। আগে এই পথে ভাড়া ছিল ৭২৭ টাকা। ভাড়া বেড়েছে ৩৫ টাকা। এখন ৫১ আসনের বাসে রাজশাহীর ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৬২১ টাকা।

নতুন বাসভাড়ার তালিকা প্রসঙ্গে বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল) মো. শহীদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা এই তালিকা মেনে ভাড়া আদায় করবেন। কেউ বাড়তি ভাড়া আদায় করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর ভাড়া বাড়ানো যৌক্তিক। কিন্তু মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর থাকবে কি না। বরাবরই সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি নেন মালিক-শ্রমিকেরা।
মো. হাদীউজ্জামান, অধ্যাপক, পুর কৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ভাড়া

বাসে দেশের সবচেয়ে দূরের পথ হচ্ছে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে টেকনাফ পর্যন্ত দূরত্ব ৪৬২ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া বেড়েছে ১২৬ টাকা। এখন এই পথে সরকার নির্ধারিত ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৩৫ টাকা। বৃদ্ধির আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ছিল ১ হাজার ৩০৯ টাকা। তা ছাড়া এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১২৬ টাকা।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৩৯৬ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৩৩ টাকা। এত দিন এই পথের ভাড়া ছিল ১ হাজার ১২৪ টাকা। অবশ্য ৫১ আসনের বাসের নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৬৭ টাকা।

ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের ভাড়া বেড়েছে ৬৭ টাকা। ৪০ আসনের বাসে এখন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫৭ টাকা। এই পথের দূরত্ব ২৪২ কিলোমিটার। আগে নির্ধারিত ভাড়া ছিল ৬৯০ টাকা।

পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও টেকনাফ পথে ৫১ আসনের বাস খুব একটা চলে না। বেশির ভাগ বাসই এসি, এসি স্লিপার এবং ৪০ আসনের বাস। এসি বাসের ভাড়া দেড় হাজার থেকে শুরু করে আড়াই হাজার পর্যন্ত নেওয়া হতো। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এসব বাসের মালিকেরা ২০০ টাকার মতো ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে ৪০ আসনের নন-এসি বাসেও ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা থেকে সিলেটের পথেও প্রচুর এসি এবং নন-এসি ৪০ আসনের বাস চলাচল করে। নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে সিলেটের দূরত্ব ২৫৭ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৯৬ টাকা। এত দিন ভাড়া ছিল ৭২৮ টাকা। অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৬৮ টাকা। এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৪ টাকা।

ঢাকা থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত ৪০ আসনের বাসের ভাড়া ৩২৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫১ আসনের বাসের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ২৫৭ টাকা। এই পথের দূরত্ব ১০২ কিলোমিটার। বাসের ভাড়া বেড়েছে ১৮ থেকে ৩১ টাকা।

বরিশাল, খুলনা, কুয়াকাটা

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশাল ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বাসে যাতায়াত করা যায়। আগে ফেরিতে পারাপার করতে হতো। এখন বরিশাল তিন-চার ঘণ্টায় চলে যাওয়া যায়। আবার খুলনায় যেতে সময় লাগে পাঁচ ঘণ্টা। তবে দ্রুত যাতায়াতের জন্য বাড়তি টাকা গুনতে হয় যাত্রীদের। এই পথের যাত্রীদের ঢাকা-ভাঙা এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুসহ ছোট–বড় আরও কিছু সেতুর টোল দিতে হয়। পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা বলছেন, দেশে সবচেয়ে বেশি টোল দিতে হয় পদ্মা সেতু হয়ে চলাচলকারী যানবাহনের।

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে বরিশালের দূরত্ব ১৭১ কিলোমিটার। ৪০ আসনের বাসে এই পথের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২৯ টাকা। এত দিন এই পথের ভাড়া ছিল ৫৩৪ টাকা। ভাড়া বেড়েছে ৯৫ টাকা। ৫১ আসনের বাসে বরিশালের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৫৩৪ টাকা।

পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনায় বাসের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৭৩৪ টাকা। এই পথের দূরত্ব ২০৫ কিলোমিটার। প্রত্যেক যাত্রীর পেছনে টোল বাবদ খরচ পড়ে ১০৭ টাকার মতো। এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৭৬ টাকা।

ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে কুয়াকাটার দূরত্ব ২৮০ কিলোমিটার। এই পথে ৪০ আসনের বাসের নতুন ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৯৯৬ টাকা। এত দিন এই পথের ভাড়া ছিল ৯০৮ টকা। অর্থাৎ ভাড়া বেড়েছে ৮৮ টাকা। এই পথে ৫১ আসনের বাসের ভাড়া দাঁড়িয়েছে ৭৮১ টাকা।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদীউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর যে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, তা যৌক্তিক। কিন্তু মূল প্রশ্নটা হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর থাকবে কি না। বরাবরই সরকারের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বাড়তি নেন মালিক-শ্রমিকেরা। এখানেই বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। তিনি বলেন, দেশের মানুষ এমনিতেই মূল্যবৃদ্ধির কষ্টে আছেন। এর মধ্যে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা যাতে বাড়তি ভাড়া আদায় করতে না পারেন, তা সরকারকেই নিশ্চিত করতে হবে।