স্পারসোর কার্যালয়ে সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়ার ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় ডিডিসির এই কাজের প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান। আগারগাঁও, ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৬
স্পারসোর কার্যালয়ে সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়ার ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় ডিডিসির এই কাজের প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান। আগারগাঁও, ঢাকা, ১৯ জুলাই ২০২৬

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই

দেশেই রকেট-স্যাটেলাইট তৈরি করে উৎক্ষেপণ করতে চায় স্পারসো

দেশেই প্রথমবারের মতো রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরি করে মহাকাশে পাঠানোর বড় পরিকল্পনা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে গড়ে তোলা হবে রকেট ও স্যাটেলাইট তৈরির কারখানা। আর পটুয়াখালীর কুয়াকাটা থেকে উৎক্ষেপণ করা হবে রকেট।

মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো) এমন একটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মাটি থেকে প্রথম রকেট উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে ৫০ থেকে ৬০ বছর।

২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডিডিসির (ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালট্যান্টস লিমিটেড) সঙ্গে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের চুক্তি করে স্পারসো। ওই মাস থেকেই সমীক্ষার কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। আজ রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে স্পারসোর কার্যালয়ে এক কর্মশালায় সমীক্ষার চূড়ান্ত খসড়ার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। সরকারের সম্মতি মিললে ২০২৭ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে।

কর্মশালায় ডিডিসির এই কাজের প্রধান পরামর্শক অধ্যাপক মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান বলেন, বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতির আকার ২০২৩ সালের ৬৩০ বিলিয়ন (৬৩ হাজার কোটি) ডলার থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ৮০ হাজার কোটি) ডলারে পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের মাত্র ১৩টি দেশের নিজস্ব রকেট উৎক্ষেপণসক্ষমতা রয়েছে। তাই বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে।

চাঁদপুরে তৈরি, কুয়াকাটায় উৎক্ষেপণ

সমীক্ষায় প্রকল্পটি তিনটি স্থানে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। কুয়াকাটায় রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্রের জন্য ৫ হাজার একর জমি প্রয়োজন হবে, এর মধ্যে মূল অবকাঠামোর জন্য ৩০০ একর, নিরাপত্তা বাফার জোনের জন্য ৫০০ একর এবং বাকি প্রায় ৪ হাজার ২০০ একর রাখা হবে সহায়ক অবকাঠামোর জন্য।

এ ছাড়া স্যাটেলাইট ও রকেটের বডি তৈরির কারখানার জন্য প্রয়োজন হবে ৪০০ একর জমি। যেটি চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে হতে পারে। খুলনায় খান জাহান আলী বিমানবন্দরসংলগ্ন এলাকায় প্রস্তাবিত স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের জন্য ব্যবহার করা হবে ৩০০ একর জমি। এটি ইতিমধ্যে অনুমোদিত ৫৩৬ একর জমির অংশ।

রকেট

ব্যয় কত, লাভ কী

সমীক্ষায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ব্যয় ও আর্থিক সম্ভাব্যতা নিয়ে। রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণে মূলধনি ব্যয় (ক্যাপেক্স) ধরা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৬৪ কোটি টাকা, যা প্রায় ৭টি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান। তবে এ খাতের আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) ঋণাত্মক ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি লাভজনক নয়।

অন্যদিকে স্যাটেলাইট উৎপাদন হাব তুলনামূলকভাবে লাভজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আইআরআর ২১ শতাংশ, তবে স্পেস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আইআরআর ঋণাত্মক, যা ৫ শতাংশ।

ডিডিসির প্রতিনিধিদের মতে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য ইতিবাচক হবে। তাদের ভাষ্য, রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্রকে তাৎক্ষণিক মুনাফার প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ‘সার্বভৌমত্বের বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখতে হবে।

জানতে চাইলে স্পারসোর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. নূর হোছাইন শরীফি প্রথম আলোকে বলেন, প্রচলিত অর্থে বিনিয়োগ ও মুনাফার হিসাব দিয়ে এই প্রকল্প বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষায়, ‘এটা তো হচ্ছে স্পেস, এটা হচ্ছে একটা রিসার্চ বা ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট। এখানে যে নলেজ তৈরি হবে, সেটাই আসল রিটার্ন (মুনাফা)।’

নূর হোছাইন বলেন, প্রাথমিক এই বিনিয়োগ স্বল্প মেয়াদে সরাসরি আর্থিক মুনাফা না দেখালেও দীর্ঘ মেয়াদে তা বিভিন্ন খাতে সঞ্চিত হয়ে দেশের সার্বিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে।

পরিবেশগত বাধা

সমীক্ষা বলছে, পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা (ইসিআর) ২০২৩ অনুযায়ী প্রকল্পের তিনটি অংশই সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘রেড ক্যাটাগরি’র মধ্যে পড়ে। ফলে নির্মাণ শুরুর আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বাধ্যতামূলক।

কুয়াকাটা উপকূলীয় এলাকাটি মোহনা বাস্তুতন্ত্র, প্লাবনভূমি ও পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) অন্তর্ভুক্ত। সেখানে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর প্রজননক্ষেত্র এবং পরিযায়ী পাখির চলাচলের পথ রয়েছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার ও উপকূল ক্ষয়ের ঝুঁকিও রয়েছে।

অন্যদিকে চাঁদপুর বা শরীয়তপুরে কারখানা নির্মাণে কৃষিজমির ওপর প্রভাব পড়তে পারে। খুলনার শিল্পপার্ক এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনটি স্থান মিলিয়ে পাঁচ বছরের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতি প্রশমন কার্যক্রমের জন্য প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। তবে এই প্রশমন বরাদ্দ যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত স্পারসোর প্রধান কার্যালয়

‘স্পেস অ্যাক্ট’ নেই

সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রকল্প পরিচালনার জন্য দেশের আইনি কাঠামোও এখনো যথেষ্ট নয়। ১৯৯১ সালের স্পারসো আইন মূলত গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বেসরকারি মহাকাশ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এর কোনো এখতিয়ার নেই।

বর্তমানে ২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের আওতায় স্যাটেলাইট ও গ্রাউন্ড স্টেশনের লাইসেন্স দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কিন্তু আধুনিক বাণিজ্যিক মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা কোনো ‘স্পেস অ্যাক্ট’ এখনো নেই।

এ ছাড়া জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা কনভেনশনের বিভিন্ন বাধ্যবাধকতাও পূরণ করতে হবে।

জনবল ঘাটতি

জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতিকেও বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সমীক্ষা। বর্তমানে স্পারসোর দক্ষতা মূলত দূর অনুধাবন ও ভূ-উপাত্ত বিশ্লেষণে সীমিত। রকেট প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট উৎপাদন কিংবা শিল্পপার্ক পরিচালনার মতো বিশেষজ্ঞ জনবল তাদের নেই।

প্রকল্পের শুরুতে ৪০০ থেকে ৬০৬ জন কর্মী লাগবে। পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রমে এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৭৬৮ থেকে ১ হাজার ১৫১ জন। শিল্পপার্ক পুরোপুরি চালু হলে সেখানে ভাড়াটে প্রতিষ্ঠানসহ ৫ থেকে ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। এ জন্য ভারতের ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন( ইসরো), জাপানের জাপান অ্যারোস্পেস এক্সপ্লোরেশন এজেন্সি (জাক্সা) ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থায় (ইএসএ) প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েটে) মহাকাশ প্রকৌশল বিভাগ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ছাড়া জমি অধিগ্রহণ, ভূরাজনৈতিক জটিলতা ও বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতাকেও ঝুঁকি হিসেবে দেখানো হয়েছে। রকেট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বিধিনিষেধ এবং শিল্পপার্কে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার চ্যালেঞ্জের কথাও সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।