
রাজধানীর ইংরেজি মাধ্যমের কিছু কিছু স্কুলে অগ্রিম বেতন ফি আদায় করছে। শিক্ষাবর্ষের (জুলাই থেকে জুন) শেষ সময় মে ও জুন— এই যুক্তিতে একসঙ্গে দুই মাসের বেতন অগ্রিম দিতে অভিভাবকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
অভিভাবকেরা বলছেন, এর ফলে তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, অগ্রিম বেতন না দিলে তাঁদের সন্তানদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র দিচ্ছে না বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের ওপর কার্যত সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চলে অনেকটাই নিজেদের মতো করে। এর আগে ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যালয়ের বেতনের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল।
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত প্লে পেন, হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল, ধানমন্ডির সামারফিল্ড বিদ্যালয়ের কয়েক শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেছেন, চলতি মাসে স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষাকে সামনে রেখে মে ও জুন মাসের বেতন ফি অগ্রিম পরিশোধ করতে অভিভাবকদের মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়েছে । কোনো কোনো বিদ্যালয় একধাপে। আবার কোনো বিদ্যালয়ে দুই ধাপে ফি পরিশোধ করতে বলেছে।
হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সন্তান অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠবে। কাল রোববার (২৮ এপ্রিল) বার্ষিক পরীক্ষা শুরু। ২৫ এপ্রিলের মধ্যে এপ্রিল, মে ও জুন মাসের বেতন পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তিনি মাসিক ১২ হাজার ২০০ টাকা করে তিন মাসের মোট ৩৬ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করেছেন। অবশ্য পরে অভিভাবকদের আপত্তির মুখে পরিশোধের শেষ তারিখ ঠিক করা হয় ৪ মে।
এর আগে ধানমন্ডির মাস্টারমাইন্ড স্কুল ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থীদের গত ১০ এপ্রিল মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত চার মাসের টিউশন ফি, ল্যাব ফি সহ অন্যান্য ফি এক সঙ্গে পরিশোধের নোটিশ পাঠায়। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অমিত দাস আইনি নোটিশ পাঠান স্কুল কর্তৃপক্ষকে।
শিক্ষার্থীদের অগ্রিম বেতনের বিষয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার প্লে পেন স্কুলের এক অভিভাবক অভিযোগ করেন, ৩ এপ্রিল মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, ১৮ এপ্রিলের মধ্যে মে মাসের এবং ১২ মে এর মধ্যে জুন মাসের বেতন পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ দু মাসের বেতন অগ্রিম দিতে হবে। আর এপ্রিলের বেতন তো দিতেই হচ্ছে। ফলে চাপ পড়ে যাচ্ছে।
ওই অভিভাবক আরও অভিযোগ করেন, যাঁরা অগ্রিম বেতন দিয়েছেন তাঁদের সন্তানদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কাল থেকে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবে। তিনি তাঁর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানের এক মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন, তাই তাঁর সন্তানকে প্রবেশপত্র দেওয়া হয়নি। তাঁর সন্তান প্রবেশপত্র না পেয়ে মন খারাপ করে বাড়ি ফিরেছে।
চাপের কথা উল্লেখ করে ওই স্কুলের আরেক অভিভাবক বলেন, তাঁর তিন সন্তান ওই স্কুলে পড়েন। তিন মাসের বেতন হিসেবে তাঁকে লাখ খানিক টাকার মতো দিতে হবে। কর্মস্থলে তাঁর মাসের বেতনও এক লাখ টাকার মতো।
প্লে পেন অভিভাবক অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আজিজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের ওপর অগ্রিম বেতন চাপিয়ে দিয়েছে। অগ্রিম বেতনের বিষয়ে তাঁরা স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাঁদের দাবি মেনে নেননি।
এ ব্যাপারে প্লে পেন স্কুলের অধ্যক্ষ সরাবন তহুরার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাঁর পক্ষে স্কুলের ব্যবস্থাপক ওয়াহিদা ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা তিন মাসের বেতন নিচ্ছেন না।এ মাসে এপ্রিলের সঙ্গে মে মাসের বেতন চেয়েছেন। আর মে মাসে জুন মাসের বেতন পরিশোধ করতে বলেছেন। বার্ষিক পরীক্ষার পর রমজান ও গ্রীষ্মকালীন দীর্ঘ ছুটি থাকবে। এ জন্যই আগে বেতন ফি পরিশোধ করতে বলা হয়েছে।
হার্ডকো ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অধ্যক্ষ জিন্নাত আলীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, যেভাবে তিন মাসের অগ্রিম বেতন নেওয়া হচ্ছিল, বিষয়টি এখন আর সেভাবে নেই। এ ছাড়া তিনি শিক্ষাদান বিষয়টি দেখেন। বেতনের বিষয়টি প্রশাসনিক। তিনি স্কুলের জ্যেষ্ঠ হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা রাশেদুল আলমের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
রাশেদুল আলম বলেন, স্কুলের নিয়ম অনুসারে এপ্রিল মাসের বেতন ১৫ তারিখের মধ্যে নেওয়া হয়েছে। মে ও জুন দুই মাসের বেতন তাঁরা মে মাসের শুরুতে অভিভাবকদের পরিশোধ করতে বলেছেন।
ধানমন্ডির সামারফিল্ড স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, মাসে নয় হাজার ৬০০ টাকা করে তিনি তিন মাসের বেতন পরিশোধ করেছেন।
এভাবে অগ্রিম বেতন নেওয়ার বিরোধিতা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অগ্রিম বেতন নেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না। অধিকাংশ ইংরেজি মাধ্যমের স্কুল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চলে।একটি দেশে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলবে— এটা গ্রহণযোগ্য নয়।