ভাসমান মানুষকে টিকাদান

‘জন্মের পর থিকা এই মাজারে, কখনো ভাবি নাই টিকা পামু’

ভাসমান মানুষদের করোনার টিকাদান কার্যক্রম চলছে। লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় মানুষ। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী মাজার এলাকায়
ছবি: দীপু মালাকার

দুটি বুথের জন্য সাতটি সারি। কয়েক শ মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন এসব সারিতে। স্বেচ্ছাসেবকেরা মাইকে ঘোষণা দিয়ে টিকার কার্ড সংগ্রহ করতে বলছেন। বুথে নিয়ম মেনে টিকা দেওয়ার নির্দেশনাও দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী মানুষ আসছেন, টিকা নিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজারে গিয়ে দেখা গেল এমন চিত্র। সেখানে পুরুষ বুথে টিকা নেন ৪০ বছর বয়সী মো. কামাল। বাঁ হাতের টিকা কার্ড দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘জন্মের পর থিকা আমি এই মাজারে। আমার কোনো ভোটার আইডি কার্ড নাই। জীবনে কখনো ভাবি নাই টিকা পামু, টিকা নিছি। হাতে একটু ব্যথা করলেও ভালো লাগতেছে।’

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় গত ৪ দিনে রাজধানীর ২ সিটির ৩০ হাজার ৮৪৫ জন ভাসমান মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নারী ১৪ হাজার ৮৪৪ জন। একই সময়ে ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বৃহস্পতিবার মিরপুরের শাহ আলী মাজারে ভাসমান মানুষকে ও বসুন্ধরার একটি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়া হয়।

৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় কমলাপুর রেলস্টেশনে ভাসমান জনগোষ্ঠীকে করোনার টিকা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়। সেদিন থেকে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ভাসমান মানুষদের করোনার জনসন অ্যান্ড জনসন টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ কার্যক্রম সমন্বয় করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকসহ আটটি সংগঠন। এ ছাড়া ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের ৫৪টি ওয়ার্ডে ভাসমান মানুষকে টিকা দিয়েছে। ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ ২ দিনে তারা ২৪ হাজার ৭০৫ জন ভাসমান মানুষকে টিকা দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে নারী ১২ হাজার ৩৪৩ জন।

এর বাইরে ব্র্যাকসহ ৮টি সংগঠনের সমন্বয়ে ডিএনসিসির ৪টি এলাকায় ১ হাজার ৯৯৫ ও ডিএসসিসির ৮টি এলাকায় ৪ হাজার ১৪৫ জন ভাসমান মানুষকে জনসন অ্যান্ড জনসনের টিকা দেওয়া হয়েছে। এই ৬ হাজার ১৪০ জন ভাসমান মানুষের মধ্যে ২ হাজার ৫০১ জন নারী।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করা টিকার সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারির হিসাব বলছে, সেদিন পর্যন্ত রাজধানীতে ১৮ হাজার ২৬৬ জন ভাসমান মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৮ হাজার ৫২৩ জন নারী। আর একই সময়ে ২ হাজার ৯৪৪ মাদ্রাসাশিক্ষার্থীকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার বসুন্ধরার ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশের প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীকে টিকা দেওয়া হয়।

ভাসমান মানুষদের করোনার জনসন অ্যান্ড জনসন টিকা দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে শাহ আলী মাজার এলাকায়

বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকায় করোনার টিকা দেওয়া শুরু হয়। যাঁদের জন্মনিবন্ধন হয়নি, জাতীয় পরিচয়পত্র নেই বা কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই—এমন ভাসমান মানুষদের টিকা দেওয়া হয়েছে এদিন। বেলা দুইটা পর্যন্ত ৬২২ জনকে টিকা দেওয়া হয়। টিকা কর্মসূচি শেষ হয় রাত আটটায়।

সাভারে থাকেন ৮০ বছর বয়সী মো. সালাম। নিজেকে ‘কবিরাজ’ পরিচয় দেওয়া সালাম বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তাঁর কোনো ভোটার আইডি কার্ড নেই। শাহ আলীর মাজারে এসে তিনি জানতে পারেন করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে। তিনিও টিকা নিয়েছেন। সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনার সময় দুইবার জ্বর–সর্দি হইছে। তখন গাছগাছড়ার ওষুধ খেয়েছি, সেরে গেছে। এখন টিকা নিলাম। শরীরে একটা জুত আইবো।’