করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com

গত তিন বছর ছিল জীবনের সবচেয়ে দ্রুততম সময়। ক্লাস, পরীক্ষা, সভা-সেমিনার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, আবৃত্তিচর্চা, পাঠচক্র—একটার পর একটা যেন লেগেই ছিল বিরামহীন ঢেউয়ের মতো। শ্যাডো ও ডাকসুর চায়ে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুদের অনেকের মুখেই তাই বেজে উঠত আক্ষেপের সুর, ‘ইশ! ক্যাম্পাস জীবন এত দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে কেন!’
মাত্র সেদিনই তো এলাম, ‘মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণে’র ভেতর দিয়ে। এফ রহমান হলটা বাঁয়ে রেখে, মুহসিন হল মাঠ পেরিয়ে, পৌষের নরম রোদ গায়ে মাখতে মাখতে।...
আর আজ এটাই কিনা শেষ বর্ষ! কিছুই তো চেনা হলো না! ছোটবেলায় টিভিতে কত দেখতাম গোলযোগের কারণে অমুক-তমুক ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে। আমাদের সময় কি একবারও হতে পারে না!
আমাদের তখনকার এই স্মৃতিকাতরতাপূর্ণ অনুযোগ কোভিড–১৯–এর মতো এমন ভয়াবহ অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে, তা কে জানত! কাছের দূরের অধিকাংশ বন্ধুর খোঁজ নিয়ে জানলাম তাদের অনুভূতি। কেউ ভাবতে পারেনি জীবনের স্বাভাবিক চঞ্চলতা ম্লান করে দিয়ে বিপর্যয় এতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। এখন উদ্ভূত পরিস্থিতির নানামুখী জটিলতায় বড় বেশি অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে সবার। গ্রামের তুলনায় জেলা ও বিভাগীয় সদরে বসবাসরত বন্ধুদের সমস্যা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
আগে শহরে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা ছুটিতে গাঁয়ে এলে ছোটখাটো উৎসব শুরু হতো বাড়িতে বাড়িতে। অথচ এখন, কোভিড–১৯–এর ভয়াল থাবা জীবনের বড় কঠিন রূপই দেখিয়ে দিচ্ছে যেন। চারপাশে এত জরুরি অবস্থা, এত সতর্কতা তবু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। জীবনের রঙিন স্বপ্নগুলো অসম্পূর্ণ রেখে, কত প্রিয়জন নিভৃতে পাড়ি জমাচ্ছেন ওপারে, কিছুই করার থাকছে না নীরবে চোখের জল ফেলা ছাড়া।
ঈদের দিন সকালে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে মেশিন নিয়ে মসজিদের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সবে কৈশোর পেরোনো ছেলেটি, চিরতরে হারিয়ে গেল মাত্র একরাতের ব্যবধানে। মৃত্যু এতটা সহজ, করোনার আগে সত্যি উপলব্ধি করিনি কখনো।
বেঁচে থাকাটাই যেন কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বের হচ্ছি না, নিয়মিত হাত ধুচ্ছি, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছি, তবু কোনো রকম একটু হাঁচি আসলেও কেমন আতঙ্কিতবোধ করছে সবাই। অন্যদিকে দিনমজুর, শ্রমিক ও স্বল্প আয়ের মানুষদের অবস্থা যে কতটা শোচনীয়, সৃষ্টিকর্তা ছাড়া তা কেউ জানে না। প্রথমদিকে অনেকেই বিভিন্ন উপায়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু সংকটাবস্থা দীর্ঘ হওয়ায় এখন সেটাও থিতিয়ে এসেছে একেবারে।
তিন মাস থেকে ঘরবন্দী। সকালে নিয়ম করে সাহিত্যের বই পড়া, বিকেলে আম্মুর রান্নার কাজে সাহায্য ও অন্যান্য কাজে দিনটা তবু কেটে গেলেও রাতটা যেন কাটতেই চায় না। সন্ধ্যা হলেই রাজ্যের সব বিষণ্নতা এসে ভর করে মনে। চাঁদনী রাত হলে একা একা খোলা আকাশের নিচে বসে থাকি। কেমন অসহ্য শূন্যতায় মূর্ত হয়ে ওঠে চারপাশ।...
ক্যাম্পাসের সব বন্ধু, শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে। কখনো ঘুমের ঘোরে শোনতে পাই টিএসসি-পলাশির কলহাস্যপূর্ণ আড্ডা, চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ। কখনো আবছায়ার মতো ভেসে ওঠে প্রিয় কিছু মুখ, বড্ড মলিন। এমন দুঃসহ সময়ের নদী পার হয়ে কার্জনের লাল বিল্ডিং, জয় তারুণ্য, বাতিঘর ও স্লোগানে মুখরিত অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে আবার কবে ফেরা হবে কে জানে!
তবু শহরের অলিগলিতে কষ্টেসৃষ্টে থাকা মানুষগুলো, কাছের দূরের বন্ধু-প্রিয়জনেরা ভালো থাকুক, সবার সম্মিলিত প্রয়াসে করোনার অশুভ ছায়া মুছে গেলে আমরা আবার ফিরব নতুন উদ্যমে, জীবনের উচ্ছ্বসিত ফেনীল স্রোতে, এই প্রার্থনা করছি।
*শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। mamunal859@gmail.com