
চারপাশে নদ-নদী, মাঝে জালের মতো বিছানো ছিল খাল, বিল ও ঝিল। নব্বইয়ের দশকে ঠিক এমনটাই ছিল রাজধানী ঢাকার চিত্র। তখন বৃষ্টি হলেও জলাবদ্ধতা হতো না। বিল-ঝিল থেকে খাল হয়ে পানি চলে যেত নদীতে।
কিন্তু গত দুই যুগে বদলেছে চিত্র। এ সময়ে রাজধানীর খাল-জলাভূমির অধিকাংশ দখল ও ভরাট হয়েছে। ময়লা-আবর্জনার দূষণে খাল পরিণত হয়েছে পয়োনিষ্কাশন নালায়। সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবছে ঢাকার রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি।
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কর্তৃপক্ষ তাদের আওতাধীন ২৯টি খাল ও ১টি জলাধারের মধ্যে ১৮টি খাল ও ১টি জলাধারের ৪২টি স্থানকে খালের ‘ডেড স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
করপোরেশন বলছে, ওই সব স্থানে অবৈধ দখল, ভরাট ও দূষণের কারণে খালের মৃত্যু হয়েছে। তাই খালের সীমানা চিহ্নিত ও অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের মাধ্যমে খালের জায়গা উদ্ধারের বিকল্প নেই। অন্যদিকে পানির প্রবাহ সচল করতে হলে খাল খননের পাশাপাশি জমে থাকা ময়লা-আবর্জনাও পরিষ্কার করতে হবে।
ঢাকা উত্তর সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে যাঁরা খাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের উদাসীনতার কারণেই এমন দশা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন খালে যে ৪২টি ডেড স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশি আছে রামচন্দ্রপুর খালে। খালটির দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯৪০ মিটার। আর প্রস্থ ১৮ থেকে ৩০ মিটার।
করপোরেশনের তালিকা অনুযায়ী এ খালে ৭টি ডেড স্পট। ডেড স্পটগুলোর মধ্যে মোহাম্মদিয়া হাউজিংয়ের ৩ থেকে ৪ নম্বর সড়ক এলাকা, মোহাম্মদিয়া হাউজিং ৬ নম্বর সড়ক, রহিম ব্যাপারী ঘাটের উত্তর পাশে, রহিম ব্যাপারী ঘাটের দক্ষিণ পাশ, মোহাম্মদিয়া হোমস লিমিটেডের সামনে, আদাবরে সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনে এবং কাউন্সিলর কার্যালয়ের বিপরীত পাশে।
সিটি করপোরেশন বলছে, খালটির দুই পাড়ে অসংখ্য অবৈধ দখলদার আছে। এই খালের সীমানা এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা যায়নি।
এরপরে কল্যাণপুর জলাধারে রয়েছে পাঁচটি ডেড স্পট। ডেড স্পটগুলো হচ্ছে জলাধারের পূর্ব পাশ, জলাধারের উত্তর-পশ্চিম পাশ, দক্ষিণ-পশ্চিম পাশ, কল্যাণপুর জলাধারের সামনে এবং মূল জলাধার।
ঢাকা উত্তর সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, জলাধার বা রিটেনশন পন্ডের জায়গাটি দীর্ঘদিন ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধানে ছিল। কাগজে-কলমে এই জলাধারের আয়তন ১৭৩ একর। তবে এখন সেখানে মোটে ৩ একরের একটা ছোট জলাশয় রয়েছে। গত এক দশকে দখল হয়েছে জলাধারটির ১৭০ একর জায়গা। যে জায়গায় পানি থাকার কথা, সেখানে এখন সারি সারি বহুতল ভবন, টিনশেডের ঘর।
চারটি করে ডেড স্পট আছে কল্যাণপুর চ খাল ও উত্তরা এলাকার আবদুল্লাহপুর খাল (খিজির খাল) এলাকায়। এর মধ্যে কল্যাণপুর চ খালের দৈর্ঘ্য ৯৮২ মিটার আর প্রস্থ ৯ থেকে ২৪ মিটার পর্যন্ত। এই খালে ডেড স্পটগুলো হচ্ছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পূর্ব পাশ, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি ভবনের উত্তর পাশ, ফিল্ম আর্কাইভ ভবনের পশ্চিম পাশ এবং রাজস্ব ভবনের পশ্চিম পাশ।
উত্তরা এলাকার আবদুল্লাহপুর খালটি স্থানীয়ভাবে ‘খিজির খাল’ নামে পরিচিত। এই খাল দিয়েই উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর, তুরাগ ও হরিরামপুর এলাকার পানি নিষ্কাশিত হয়। সিটি করপোরেশন এই খালের উত্তরা-১০ নম্বর থেকে উত্তরা-১২ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত চারটি অংশকে মৃতপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। স্থানগুলো হচ্ছে আবদুল্লাহপুর স্লুইসগেট থেকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর থাকা সেতু, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর থেকে চণ্ডালভোগ সেতু, ফুলবাড়িয়া টেকপাড়া থেকে উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টর এবং উত্তরা ১১ নম্বর থেকে ফুলবাড়িয়া এলাকা পর্যন্ত। করপোরেশনের হিসাবে এই খালের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ১৬০ মিটার আর প্রস্থ ১৮-৩৬ মিটার পর্যন্ত। ডেড স্পটের কারণে ওই এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পানি সরতে পারে না। জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়েন তুরাগ ও হরিরামপুর এলাকার কিছু অংশের মানুষ।
মিরপুরের ইস্টার্ন হাউজিং আবাসিক এলাকার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় খালটিকে স্থানীয়ভাবে ইস্টার্ন হাউজিং খাল নামে ডাকা হয়। তবে এর কাগুজে নাম দ্বিগুণ খাল। খালের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৫৮৮ মিটার আর প্রস্থ জায়গাভেদে ২২ থেকে ৬০ মিটার পর্যন্ত। সিটি করপোরেশনের হিসাবে এই খালের ৩টি স্থানে ডেড স্পট আছে। স্পটগুলো হচ্ছে ইস্টার্ন হাউজিংয়ের জি ব্লকের ২ নম্বর রাস্তার মাথা থেকে বাঁশের সাঁকো হয়ে বায়তুল ইবাদাহ জামে মসজিদ পর্যন্ত অংশে, ইস্টার্ন হাউজিংয়ের কে-৭ প্লটের সামনে এবং হাউজিংয়ের এল ব্লকের বকুলতলা এলাকায়।
কাগজে-কলমে মিরপুর এলাকার বাইশটেকি খালের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ২৮০ মিটার আর প্রস্থ ১২ মিটার। এই খালেও ৩টি ডেড স্পট রয়েছে। স্পটগুলো হচ্ছে পলাশনগর সবুজ বাংলা নতুন সেতু থেকে গৃহায়ণের জয়নগর প্রকল্পসংলগ্ন এসটিএস পর্যন্ত, মিরপুর-১১ সি ব্লকের অ্যাভিনিউ-৫–এর সবুজ বাংলা এলাকা এবং একই ব্লকের মদিনা নগর এলাকা।
করপোরেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালের নিচের দিকে ৮৫৩ মিটার এলাকায় খালটি ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দাবি করে দখল করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ করে খাল প্রশস্তের কাজ চলছে।
অন্যদিকে মিরপুর এলাকার সাগুফতা খাল, ভাষানটেক খাল ও প্যারিস খাল এবং মোহাম্মদপুর এলাকার কাঁটাসুর খালে দুটি করে ডেড স্পট রয়েছে। সাগুফতা খালের কালশী স্টিল সেতুর উত্তর পাশে ও উত্তর পাশে থাকা কাঁচা রাস্তার কোনায়, ভাষানটেক খালের বাঁশের সাঁকো এলাকা ও রূপসী বাংলার দক্ষিণে, প্যারিস খালের মিরপুর-১০ ডি ব্লক এলাকায় ও জুটপট্টি এলাকায় এবং কাঁটাসুর খালের ঢাকা রিয়েল এস্টেট এলাকার পুরোনো দুটি কালভার্টের নিচে ও কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের ২ থেকে ৬ নম্বর সড়ক এলাকায়।
এ ছাড়া একটি করে ডেড স্পট আছে ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন ৮টি খালে। এর মধ্যে রামপুরা খালের এ ব্লকের ৯ নম্বর রাস্তা, গোদাগাড়ী খালের দক্ষিণ বিশিলের ৬/বি/১ নম্বর বাড়ি, বসুপাড়া খালের ৩য় কলোনি এলাকায় ৬৫/৪/এ বাড়ির সামনে, বগারমার খালের আনন্দবাজার থেকে ভাঙা সেতু, ইব্রাহিমপুর খালের হাবিবুল্লাহ সড়কের বাঁশের পুল এলাকা, বাউনিয়া খালের দিগন্ত পেট্রলপাম্প থেকে কালশী স্টিল সেতু, সাংবাদিক খালের কাল সড়ক সেতু থেকে দক্ষিণ দিকে এবং মুসলিম খালের মসজিদুল জুমা কমপ্লেক্স থেকে কালশী মূল সড়ক পর্যন্ত এলাকা ডেড স্পট আছে।
ডেড স্পট হিসেবে চিহ্নিত ৪২টি স্থানের (১৮টি খাল ও ১টি জলাধার) মধ্যে ৩৬টি স্থান (১৩টি খালে) গত মার্চ মাসে সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। একই স্থানগুলো চলতি জুন মাসের ২ ও ৩ তারিখ আবার ঘুরে দেখেছেন তিনি। ১৩টি খালের জায়গায় দেখা গেছে রাজনৈতিক কার্যালয়, বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন, বস্তিঘর, শৌচাগার এবং চায়ের দোকান—ছয় ধরনের অবৈধ স্থাপনা। এসবের ফল হচ্ছে, খাল সরু হয়ে কোথাও নালা হয়ে গেছে।
খালের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবার কিছু জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ও বালু-মাটি জমে খালের গভীরতা কমেছে। এ ছাড়া খালে ফেলা হচ্ছে আবর্জনা ও পুরোনো আসবাব। বিভিন্ন খালের ওপর করা বক্স কালভার্টের নিচে সেগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে আটকে থাকছে। আবার কোথাও কোথাও খালে বাঁশ-কাঠ পুঁতে ও সিমেন্টের বস্তা ফেলে রাস্তা তৈরি করায় পানি চলার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছে।