
রাস্তা ধরে মানুষ আসছে নদীর ঘাটের দিকে। রাস্তার পাশে টিনের সারি সারি দোকান। ছোট ছোট কিছু ভবন। নদীতে ভাসছে নৌকা আর লঞ্চ। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এই বর্ণনা শুনলেই বুঝবেন এটি ঢাকার সদরঘাট। ১৯৬২ সালের পুরোনো এই ছবি পাওয়া গেল ঢাকার পুরোনো ছবির বিভিন্ন গ্রুপে। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা এই সদরঘাটকে ঘিরে উনিশ শতকে ঢাকা ব্যবসায়িক জনপদ গড়ে ওঠে। এই নদীর পাড়েই পুস্তক প্রকাশনার ঘাঁটি বাংলাবাজার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বলধা গার্ডেন, আহসান মঞ্জিল, মাছ ও ফলের সুবিশাল সব আড়ত।
সদরঘাট আহসান মঞ্জিলের বাঁ দিকে অবস্থিত। ঢাকাকোষগ্রন্থে বলা হয়েছে, ঢাকামুখী নৌকা, লঞ্চ এবং এমনকি ছোট ও মাঝারি জাহাজ নোঙর করার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল। ১৮২০ সালের দিকে সদরঘাটের পূর্বদিকে ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টরের অফিস পর্যায়ক্রমে স্থানান্তরিত হয়। এর উত্তর দিকের এলাকাগুলো নতুন নগরকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সদরঘাট ছাড়াও বুড়িগঙ্গা তীরের আরেক ঘাট ওয়াইজঘাট থেকেও লঞ্চ-স্টিমার ছাড়ত সেই ব্রিটিশ আমলেই। সদরঘাট থেকে শহরে যাওয়ার মাত্র দুটি প্রধান রাস্তা ছিল—একটি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে এবং অপরটি দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে। রাস্তা দুটি সদরঘাটের কাছাকাছি সমকোণে মিলিত হয়েছে। অলিগলির অনেক এলোপাতাড়ি শাখা এখান থেকে শহরের বিভিন্ন মহল্লায় চলে গেছে।
তবে ১৯৬২ সালের ছবিটির সঙ্গে আজকের সদরঘাটের পার্থক্য অনেক। তখন নদীর পাড়ে কোনো স্থায়ী ঘাট না থাকলেও এখন সেখানে একটি টার্মিনাল গড়ে উঠেছে। আশপাশে উঠে গেছে উঁচু উঁচু সব ভবন। ফলে নদী থেকে এখন আর আগের মতো রাস্তা দেখা যায় না। তবে আগের মতোই এখনো ব্যস্ততা আছে সদরঘাটে।
এই নদীবন্দর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, ঝালকাঠি, মাদারীপুর, চাঁদপুর, খুলনা, হাতিয়া, বাগেরহাটসহ মোট ৪৫টি পথে লঞ্চ ও স্টিমার ছেড়ে যায়। মালামাল বহনকারী বার্জগুলোও সদরঘাটকে মাল ওঠানো-নামানোর কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে। পাশপাশি সরদঘাট ফলমূল, শাকসবজি ও বিবিধ সামগ্রীর একটি বৃহৎ দৈনিক বাজারে পরিণত হয়েছে। স্টিমার-লঞ্চ ছাড়াও ডিঙি নৌকাগুলো সদা ব্যস্ত যাত্রী নিয়ে এপার-ওপার খেয়া বাইতে। সব সময় লেগে থাকে কুলিদের শোরগোল। সব মিলিয়ে কয়েক শ বছর ধরেই ব্যস্ত ঢাকার সদরঘাট। লেখা: শরিফুলহাসান। ছবি: হাসানরাজা