>করোনাভাইরাস পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ-বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন তাঁদের এ সময়ের আনন্দ-বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন। পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com
শূন্য কারও কাছে প্রিয় অঙ্ক, আবার কারও কাছে নয়।
শূন্য নিজে জানে কি না জানি না, কিন্তু আমরা শিক্ষিত মানবজাতি প্রায় সবাই জানি, শূন্য যখন একাই বা ০, এই অবস্থায় থাকে তখন তার দাম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী মানুষের দামের সমান। কিন্তু যখন শূন্য (০) কোনো অঙ্কের পেছনে বসে (১০০০...) তখন তার দাম অনেক (করোনায় সুস্থ হয়ে বেঁচে ফেরা মানুষের সমান)।
এখন যদি আপনাকে এসে বলে আপনার প্রিয় অঙ্ক কোনটি?
কেউ হয়তো বলবে ১, আবার কেউ বলবে ৫...আবার কেউ হয়তো বলবে ০ থেকে ৯–এর মধ্যে যেকোনো একটি!
কিন্তু আমাকে যদি এখন বলতে বলা হয় তাহলে আমি বলব শূন্য (আগে হলে অন্য কিছু বলতাম।
কারণটা বলছি,
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। তাই প্রায় তিন মাস হয় আমার মতো অনেকেই গ্রামে। প্রতিবার গ্রামে এসে গ্রামের যে কোলাহল রূপ দেখি, তা এবার সম্পূর্ণ বিপরীত। চারদিকে মনে হচ্ছে সুনসান নীরবতা। পাড়ার মোড়ে আগের মতো ভিড় নেই, নিন্দুকের নিন্দা শোনার লোক নেই, চায়ের টংয়ে সুখটান (চায়ে চুমুক দেবে আর সুখের গল্প করবে) দেওয়ার কেউ নেই।
কিন্তু যাঁরা দিন আনে দিন খান, তাঁদের তো বসে থাকলে হবে না। কে দেবে তাঁদের খাবার?
তাই পেটের চিন্তা করে এই মহামারি উপেক্ষা করেও তাঁদের বের হতে হয় দুই বেলা খাবার জোগানোর জন্য। কী বা করবেন তাঁরা? খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে তো!
এভাবেই তাঁদের দিন কাটে!
প্রকৃতি তো আর বোঝে না করোনা কী? তাই তাকে চলতেই হয় প্রকৃতির লীলায়। এভাবেই সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়, আড়াইটা বাজে, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা, রাত হয় কিন্তু অনেকের করোনা নিউজ শোনা হয় না।
কিন্তু কেন?
কারণ, অনেকে কাজে যান আবার কারও বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই বা কারও টিভি নেই।
আবার অনেকেই পাশের বাড়িতে গিয়ে টিভিতে সেই আড়াইটার খবর শোনেন। আবার কেউবা অন্য কারও মুখে শুনে নেন।
কিন্তু আমি আড়াইটায় টিভি দেখি। কিন্তু আমার মা–বাবা কেউ দেখতে পান না। কারণ, বাবা বাইরে থাকেন কাজের জন্য, আর মা রান্না আর বাড়ির কাজ সামাল দিতে খবর শোনা হয় না।
তাই আড়াইটা বাজলেই রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসে উৎসব আজকে কত?
আমি উওর দিই: মা ৩০০০–এর বেশি।
মা বলে: এতগুলো...তোর বাপকে এত মানা করি যেন বাইরে না যায়, সে তো শুনবেই না কোনো কথা...আরও দু–এক কথা বলে দিল।
‘আর মরছে?’
‘মা ৪৬ জন।’
এসব শুনে মা রান্নাঘর থেকে উঁচু গলায় চিৎকার করে পাশের বাড়ির কাকিকে বললেন: এই শুনেছিস আজ ৩০০০–এর বেশি আক্রান্ত আর মরছে ৪৬ জন।
কাকি: কী কস? এতগুলো!
এভাবে সবার কানে কানে ছড়িয়ে যায় আড়াইটার খবর।
আর আমি টিভির সামনে বসে এসব শুনছি, আর ফেসবুকে স্টোরি দিয়ে বন্ধু মহলকে জানিয়ে দিচ্ছি।
আর ভাবছি শূন্যের প্রতীক্ষায় আরও একটি আড়াইটা চলে গেল।
এভাবে দিন কাটে। আবার সকাল হয়। আবার সেই আড়াইটা...
আমার সেই প্রতীক্ষা...
আজ বুঝি আক্রান্ত ও মৃত্যু শূন্য শুনতে পারব। মাকে বলতে পারব হাসিমুখে...
‘মা আজকে কোনো আক্রান্ত নেই এবং কেউ মরে নাই।’
কিন্তু আমার সেই প্রতীক্ষা আজকের এই আড়াইটাও পূরণ করতে পারল না।
পরের দিন ভাবলাম, না! আজকে নিশ্চয়ই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা শূন্য শুনতে পারব।
কিন্তু আজও হতাশ হয়ে বসে থাকতে হলো।
এভাবেই শূন্যের প্রতীক্ষায় প্রতিদিন অপেক্ষা করি। কিন্তু প্রতীক্ষা আর ফোরাচ্ছে না।
আমি কি শূন্য শুনতে পারব?
মাকে কী বলতে পারব শূন্য?
নাকি তার আগে আমি শূন্য হয়ে যাব?
কালকের আড়াইটার শূন্যের প্রতীক্ষায় রইলাম।
* প্রথম বর্ষ, পুরকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। utsabkumar39@gmail.com