ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা অভিমুখে ফ্লোটিলার ছবি দেখছেন দর্শকেরা। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পান্থপথের দৃক পিকচার্স লাইব্রেরিতে
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা অভিমুখে ফ্লোটিলার ছবি দেখছেন দর্শকেরা। শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পান্থপথের দৃক পিকচার্স লাইব্রেরিতে

শিল্পের সৌন্দর্য ও প্রতিবাদে গ্যালারিগুলো নয়নাভিরাম

কোনো গ্যালারির দেয়ালে চিত্রকলার নান্দনিক সুষমা। ভাস্কর্যের অনিন্দ্যসুন্দর উপস্থাপনা কোনো গ্যালারির মেঝেতে। আবার কোনো গ্যালারিতে ঝুলছে দিগন্তজোড়া মাঠের ছবি, সেখানে চরে বেড়াচ্ছে মহিষের পাল। আবার প্রতিবাদের ছবিও কোনো গ্যালারিতে। সেখানে দেখা যাবে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে গাজা অভিমুখে নৌযাত্রা ফ্লোটিলার ছবি। রাজধানীর গ্যালারিগুলো এখন এমনই সব বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকলার উপস্থাপনায় সৌন্দর্যে–প্রতিবাদে হয়ে আছে নয়নাভিরাম। শিল্পানুরাগী দর্শকেরা শেষ বেলায় গ্যালারিতে এসে উপভোগ করছেন শিল্পীদের এসব সৃজনসম্ভারের অপার সৌন্দর্য।

ঢাকা-সিঙ্গাপুরের মেলবন্ধন

সিঙ্গাপুরের ৬১তম জাতীয় দিবস উদ্‌যাপন উপলক্ষে শুক্রবার শুরু হলো ঢাকা ও সিঙ্গাপুরের শিল্পীদের যৌথ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘ব্রিজিং হরাইজনস: আ ভিজ্যুয়াল ডায়ালগ অব নেচার, হেরিটেজ, ইনোভেশন’ নামের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে ঢাকায় সিঙ্গাপুর প্রজাতন্ত্রের হাইকমিশন। প্রদর্শনী চলবে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত।

সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বরেণ্য শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মিচেল লি, বিশেষ অতিথি ছিলেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক এম ফ্রাঁসোয়া শম্ব্রো। প্রদর্শনী কিউরেট করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক হারুন অর রশিদ। বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের অগ্রগণ্য শিল্পীদের বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্ম রয়েছে এ প্রদর্শনীতে।

অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশের শিল্পীরা হলেন রফিকুন নবী, মোহাম্মদ ইউনুস, জামাল আহমেদ, আহমেদ শামসুদ্দোহা, মোস্তাফিজুল হক, শেখ আফজাল, মো. মুনিরুজ্জামান, কনক চাঁপা চাকমা, আজহারুল ইসলাম শেখ, মোহাম্মদ ইকবাল, আনিসুজ্জামান আনিস, কারু তিতাস, হারুন অর রশিদ ও সৌরভ চৌধুরী।

সিঙ্গাপুরের শিল্পীরা হলেন গোহ বেং কোয়ান, নাই সুই লেং, লি হক মোহ, অ্যান্ড্রু ইয়েও, থমাস ইয়ো, তাং জুয়ে লি, টে বাক কোই, ওং কিম সেং, অ্যারন গান, তান চেং চেং, পি ভি হং লাম, তান কিয়ান পোর ও লো পুয়ে হুয়া।

প্রদর্শনী উপলক্ষে বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁদের মধ্য থেকে ১২ জন শিল্পীকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাঁদের মধ্যে সেরা ছয়জনের শিল্পকর্মও প্রদর্শিত হচ্ছে।

কলাকেন্দ্রে অন্তঃস্রোত

ভাস্কর সুমন বর্মণের ভাস্কর্য প্রদর্শনী অন্তঃস্রোত শুরু হয়েছে লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে। ভাস্কর (দাঁড়ানো) তাঁর কাজ দেখাচ্ছেন এক দর্শককে

ছোট ছোট অজস্র ঢেউ তুলে যেমন নদীর স্রোতোধারা নিরন্তর বয়ে যায়, যেমন জেগে ওঠা বালুচরে সেই ঢেউয়ের ছাপ ফুটে ওঠে—তেমনি করেই কাঠের ওপরে ঢেউ সৃষ্টি করেছেন তরুণ প্রজন্মের প্রতিভাবান ভাস্কর সুমন বর্মণ। ‘অন্তঃস্রোত’ নামে তাঁর তৃতীয় একক ভাস্কর্য প্রদর্শনী গতকাল থেকে শুরু হলো লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে।

অনুভূমিক পাটাতনের ওপরে উল্লম্ব বিন্যাসের ভাস্কর্যগুলো স্থাপন করেছেন সুমন বর্মণ। মোট সাতটি ভাস্কর্য রয়েছে। কাজগুলো আকারে যথেষ্ট বড়। প্রতিটির মাধ্যমই কাঠ। পাটাতনে মেহগনি আর তার ওপর মানব দেহাবয়বের ভাস্কর্যগুলো শিলকড়ই, গর্জন, চাপালিশসহ বিভিন্ন কাঠের গুঁড়ি, কাণ্ড বা তক্তা ব্যবহার করেছেন তিনি। হাতুড়ি-বাটাল ঠুকে ঠুকে নদীর ঢেউয়ের মতো এক অন্তর্গত স্রোতোধারা তিনি রচনা করেছেন এসব অবয়বে।

ছুটির দিনের সন্ধ্যায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক লালারুখ সেলিম ও স্থপতি নাঈম আহমেদ কিবরিয়া। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রদর্শনীর কিউরেটর ও কলাকেন্দ্রের পরিচালক শিল্পী ওয়াকিলুর রহমান। ভাস্কর সুমন বর্মণ তাঁর ভাবনা তুলে ধরেন। প্রদর্শনী প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।

প্রকৃতির কাব্যিক ছবি

শিল্পী রাশেদ জামানের একক দৃশ্যশিল্প প্রদর্শনী ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ উদ্বোধনের পর ছবি দেখছেন দর্শকেরা। শুক্রবার ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে

ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শন কক্ষের দেয়ালজুড়ে পদ্মার চর ও তীরঘেঁষা নিসর্গের নয়নাভিরাম দৃশ্যমালা মুগ্ধ চোখে দেখছেন দর্শকেরা। শুক্রবার বিকেলে এমনই দেখা গেল। সারি বেঁধে দর্শকেরা প্রবেশ করছেন তিমান চিত্রগ্রাহক ও শিল্পী রাশেদ জামানের একক দৃশ্যশিল্প প্রদর্শনী ‘দ্য কোয়ায়েট উইদিন’ দেখতে। বৃহস্পতিবার থেকে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শুরু হয়েছে এই প্রদর্শনী।

প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত এইচ ই ড. রুডিগার লোটজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম। প্রদর্শনী ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

দৃশ্যমাধ্যম শিল্পী রাশেদ জামান প্রকৃতি ও নির্জনতার এক মায়াময় আবহ তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর কাজে। প্রদর্শনী কক্ষে শুক্রবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ২০২০ সালে থেকে তিনি রাজশাহী, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়াসহ পদ্মাসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে এ দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় ধারণ করেছেন। পরে সেগুলো ক্যানভাসে বড় আকারে প্রিন্ট করে তার ওপরে ব্রাশে অ্যাক্রিলিকের কাজ করেছেন। এসব দৃশ্যে দর্শকেরা দেখবেন ধু ধু চরে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ গাছ, আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘ, চরে বেড়ানো মহিষের পাল, ভাসতে থাকা নৌকাসহ চোখজুড়ানো দৃশ্যমালা।

দৃকে ফ্লোটিলার ছবি

পান্থপথের দৃক পিকচার লাইব্রেরিতে শুরু হলো ‘ফ্লোটিলা: বাংলাদেশ সেইলস ফর গাজা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের গণহত্যার প্রতিবাদে গাজা অভিমুখে নৌযাত্রায় অংশগ্রহণকারী দুই ব্রিটিশ-বাংলাদেশি জুবায়ের ইসলাম খান ও মোহাম্মদ আলী এবং বাংলাদেশের খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের গাজামুখী যাত্রার গল্প তুলে ধরা হয়েছে এতে। তাঁরা অবরুদ্ধ গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের অবৈধ অবরোধকে চ্যালেঞ্জ করার প্রচেষ্টায় ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের (এফএফসি) সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ যাত্রায় অংশ নেন।

গাজা অভিমুখে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে এবং চলতি বছর মে মাসের দুটি পৃথক ফ্লোটিলায় তাঁরা তিনজন অংশ নিয়েছিলেন।

শুক্রবার সন্ধ্যায় পান্থপথের দৃকপাঠ ভবনে প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রমাদান ও ফ্লোটিলায় অংশগ্রহণকারী জুবায়ের ইসলাম খান, মোহাম্মদ আলী, শহিদুল আলম এবং প্রদর্শনীটির কিউরেটর এ এস এম রেজাউর রহমান বক্তব্য দেন।

প্রদর্শনী সম্পর্কে এ এস এম রেজাউর রহমান জানান, এই তিনজন কীভাবে সেখানে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা কী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, প্রদর্শনীতে তা উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রদর্শনীর একটি অংশে আছে কেৎজিয়েত কারাগারের একটি শৈল্পিক উপস্থাপন।

প্রদর্শনীটি ২৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত চলবে।