তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন মোটরসাইকেলের রাইডশেয়ার চালক ইমরান হোসেন। আজ বেলা ২টার সময় মতিঝিলের বাফুফে সামনে থেকে তোলা
তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন মোটরসাইকেলের রাইডশেয়ার চালক ইমরান হোসেন। আজ বেলা ২টার সময় মতিঝিলের বাফুফে সামনে থেকে তোলা

তিন স্টেশনে পুলিশ মোতায়েন

‘দুই দিন ধরে তেলের জন্য ঘুরছি, তেল নাই, ভাড়াও নিতে পারিনি’

দুই দিন ধরেই রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য ঘুরছেন মোটরসাইকেলের চালক ইমরান হোসেন। তিনি মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন। ফলে এই দুই দিন ধরে কোনো যাত্রীই পরিবহন করতে পারেননি ইমরান।

আজ বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে রাজধানীর মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে যখন এই চালকের সঙ্গে কথা হয়, তখন তাঁর সামনে তিন শতাধিক মোটরসাইকেল তেলের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। এদিকে পাম্পের মালিক জানান আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা লোকজনের সঙ্গে পাম্পের কর্মী ও লাইনে থাকা চালকদের তিনবার মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

মোটরসাইকেলের চালক ইমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই দিন ধরে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরছি। এখনো তেল নিতে পারিনি। আজও তেল পাব কি না, জানি না। আল্লাহ ভাগ্য রাখলে হয়তো পাব। কিন্তু ভোগান্তি অনেক। এই দুই দিন অফ ডে যাচ্ছে। একটা ভাড়াও নিতে পারিনি।’

এই রাইডশেয়ার চালক জানান, গতকাল রামপুরার হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাননি। ফিলিং স্টেশনের কাছাকাছি আসতেই তেল শেষ হয়ে যায়। এরপরে মহাখালী, তেজগাঁও, আসাদগেট এলাকায় ১০টির বেশি স্টেশন ঘুরেন। বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকার কারণে বন্ধ দেখতে পান। বাকি যেগুলো চালু ছিল সেগুলোতেও দীর্ঘ লাইন। ফলে তিনি আর লাইনে দাঁড়াননি।

আজ ভোর পাঁচটার সময় রাজধানীর মৎস্যভবন মোড়ে রমনার ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ান বলে জানান ইমরান হোসেন। সেখানে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এরপরও ডিপো থেকে তেল না আসতে দেখে লাইন থেকে বের হয়ে পরীবাগে অবস্থিত মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে যান। সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখে আর দাঁড়াননি। চলে আসেন মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে।

তেলের জন্য প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। বেলা্ ১টার দিকে আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশন থেকে তোলা

এই মোটরসাইকেলের চালক বলেন, ‘আগে একটি ওষুধ কোম্পানিতে জব করতাম। সেটি ছাড়ার পর নতুন চাকরি খুঁজতেছি। আপাতত না পেয়ে রাইড শেয়ার করি। কিন্তু এখানে এসে পড়লাম চরম ভোগান্তিতে। শুধু আমি না, লাখ লাখ বাইকার এই ভোগান্তির শিকার। কিছু তো আর করার নাই।’

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত তেল না পাওয়া চালকের সংখ্যা অনেক। বেলা ১টার সময় রাজধানীর আরামবাগে অবস্থিত মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে কথা হয় প্রাইভেটকারের চালক মোহাম্মদ সুলতানের সঙ্গে। তিনি জানান, গতকাল এই ফিলিং স্টেশনে ১১ ঘণ্টা অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত তেল পাননি। আজ ভোর পাঁচটার সময় লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি চলছে। এই যুদ্ধবিরতির সময়ে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সংকট কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে বলে মনে করেন চালক মোহাম্মদ সুলতান। তিনি বলেন, ‘দিন দিন দেখতেছি ভোগান্তি আরও বাড়ছে, তেল নিতে আমাদের আরও বেশি সময় লাগছে। ভোগান্তি কমার পরিবর্তে উল্টো বেড়েছে।’

সবচেয়ে দীর্ঘ লাইন

গাজীপুর থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকায় আসেন রাইড শেয়ার চালক আবু জোহা। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় ভোর সাড়ে ৫ টা থেকে অপেক্ষা করছেন। বেলা ১ টার সময় আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশন থেকে তোলা

রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘুরে গত দুই সপ্তাহ তেলের জন্য যে লাইন দেখা গেছে, সে তুলনায় আজ বৃহস্পতিবারের লাইন ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ।

বেলা ১১টার সময় রাজধানীর রাজারবাগ ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে, মোটরসাইকেলের লাইন আজ বিএনএন হসপিটাল অতিক্রম করে শান্তিবাগের গলির মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। অথচ গত দুই সপ্তাহে ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে মোটরসাকেলের লাইন সর্বোচ্চ শহীদবাগের বিএনএন হসপিটালের সামনে পর্যন্ত দেখা গিয়েছিল।

আগে এই স্টেশনে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ১১৫টি দেখা গেলেও আজকে দেখা গেছে ২২৩টি। প্রাইভেটকারের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮৯টি দেখা গেলেও আজ ১৬৬টি দেখা গেছে।

একই চিত্র দেখা গেছে আরামবাগের মেসার্স এইচকে ফিলিং স্টেশনে। এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ মোটরসাইকেলের লাইন স্টেশনের সামনে থেকে সর্বোচ্চ ফকিরাপুল পর্যন্ত দেখা গেছে। কিন্তু সেই মোটরসাইকেলের লাইন আজ ফকিরাপুল ঘুরে রাজারবাগ পুলিশ বক্স ঘুরে এজিবি কলোনির গলি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এই ফিলিং স্টেশনে এর আগে তেলের জন্য অপেক্ষা করা মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩৭টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩৯৪টি। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩২টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩২৯টি।

একই রকম চিত্র দেখা গেছে মতিঝিলের করিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে। এই ফিলিং স্টেশনে গত দুই সপ্তাহ ধরে মোটরসাইকেলের লাইন সর্বোচ্চ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনের সামনে পর্যন্ত দেখা গেছে। আজকে সে মোটরসাইকেলের লাইন বাফুফে ভবন ঘুরে গাজী দস্তগীর সড়কের মাঝামাঝি পৌঁছে গেছে। এর আগে এই ফিলিং স্টেশনে বাইকের সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩৪টি দেখা গেলেও আজ দেখা গেছে ৩০২টি।

বিশৃঙ্খলা এড়াতে পুলিশ মোতায়েন

তিনটি ফিলিং স্টেশনে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আজ পুলিশ মোতায়েন করতে দেখা গেছে। বেলা ১টার দিকে আরামবাগের মেসার্স এইচ কে ফিলিং স্টেশনে লাইন অতিক্রম করে তেল নেওয়ার চেষ্টা করা কয়েকজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরিয়ে দিতে দেখা গেছে।

বেলা ২টার সময় মতিঝিলের করিম ফিলিং স্টেশনেও লাইনের বাইরে থেকে তেল নিতে আসা গাড়িগুলোকে পুলিশ সরিয়ে দেয়। এই ফিলিং স্টেশনের মালিক আবদুস সালাম প্রথম আলোকে জানান, আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তিনবার পাম্পের কর্মীদের সঙ্গে চালকদের ও লাইন অতিক্রম করা নিয়ে চালকেরা নিজেদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘এসব এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পুলিশ সদস্যরা আছেন। তাঁরা শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করছেন।’

চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না বলে জানান আবদুস সালাম। তিনি বলেন, আগে যেখানে ১৩ হাজার লিটার অকটেন পেতেন, সেখানে এখন সাড়ে ৪ হাজার লিটার পাচ্ছেন। এই তেল কয়েক ঘণ্টার ভেতর শেষ হয়ে যায়। এরপর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তাঁদের (পাম্পের লোকজন) সঙ্গে ঝগড়া শুরু করেন।