সম্মেলনে একক বক্তৃতা দেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক পল্লবী রায় । ২৫ জুলাই
সম্মেলনে একক বক্তৃতা দেন সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক পল্লবী রায় । ২৫ জুলাই

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় নিয়ামক হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ

আজবাংলাদেশ ও ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের অন্যতম বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন। শুধু নয়াদিল্লি ও ঢাকার সিদ্ধান্ত নয়, কলকাতার রাজনীতিও ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

শনিবার বিকেলে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (ডায়রা) আয়োজিত ‘বেঙ্গল ডেলটা কনফারেন্স ২০২৬’ সম্মেলনের একক বক্তৃতায় সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক পল্লবী রায় এ মন্তব্য করেন।

‘হোয়েন বর্ডার্স ক্যাননট সেপারেট পলিটিকস: ওয়েস্ট বেঙ্গলস পলিটিক্যাল ট্রান্সিশন, হোয়াই ইট হ্যাপেনড, অ্যান্ড ইটস ইমপ্যাক্ট অন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বক্তৃতায় পল্লবী রায় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বাংলাদেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে কথা বলেন।

পল্লবী রায়ের মতে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি অনানুষ্ঠানিক সেতুবন্ধ বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করেছে। কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও পশ্চিমবঙ্গ প্রায়ই দুই দেশের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এই বাফার দুর্বল হয়ে গেলে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। সীমান্ত আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।

পল্লবী রায় বলেন, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে দিল্লি যদি আবারও উন্নয়ন সহযোগিতা ও অবকাঠামো প্রকল্পকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করে, তাহলে বর্তমান সরকারের জন্য সেই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে যে জনমত গড়ে উঠেছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি।

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে পল্লবী রায় বলেন, তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যাকে কেবল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতা পুরোটা ধরা পড়ে না। কারণ, নদীটির প্রবাহের বড় অংশ সিকিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে শুধু পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার ও সিকিমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

বক্তৃতার শেষ অংশে পল্লবী রায় পরিচয়ের রাজনীতিকে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, চ্যালেঞ্জটি কেবল নির্বাচন বা সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে ‘বাঙালি’ পরিচয়কে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য করা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

পল্লবী রায় আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এটি ভারতের একটি রাজ্যের পরিচয়ের প্রশ্ন, আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে ‘বাঙালি’ পরিচয় ও জাতীয় পরিচয়কে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সহাবস্থানকারী পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা দুই দেশের সম্পর্কের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে।