মোটরসাইকেলচালক দেলোয়ার হোসেন আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন তাঁর দুর্ভোগের কথা
মোটরসাইকেলচালক দেলোয়ার হোসেন আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন তাঁর দুর্ভোগের কথা

‘বাইক রাইখা বোধ হয় রিকশা চালাইতে হইব’

‘বাইক রাইখা বোধ হয় রিকশা চালাইতে হইব। কারণ, রিকশাতে তো অতে খরচ নাই,’ বলছিলেন দেলোয়ার হোসেন, ঢাকার আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশনের সামনে। নিজের মোটরসাইকেলের জন্য জ্বালানি তেল কিনতে এসেছিলেন তিনি।

আজ বুধবার দুপুরে যখন দেলোয়ারের সঙ্গে কথা হয়, তখন লাইনে তাঁর দাঁড়িয়ে থাকার তিন ঘণ্টা পার হয়েছে। এতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে বাইক ঠেলে ঠেলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।

রাইড শেয়ারে মোটরসাইকেল চালানোই দেলোয়ারের পেশা। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে যতটুকু অকটেন পাবেন, তা দিয়ে বেশিক্ষণ চালাতে পারবেন না। সেটাও তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ।

দেলোয়ারের মতো হাজারো চালকের জন্য বড় দুর্ভোগ ডেকে এনেছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। বিশ্বের তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এই যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির। সংকটের আঁচ বাংলাদেশেও লেগেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে সারা দিন লাইন লেগে আছে। কোনো কোনো স্টেশনে বিক্রি বন্ধও হয়ে আছে।

এই ভোগান্তিতে পড়ে দেলোয়ারের রিকশাকে শ্রেয় মনে হচ্ছে। কারণ, তা চালালে জ্বালানি তেল কেনার এই দুর্ভোগে পড়তে হতো না।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের অনেক টাকা খরচ হয়, মবিল লাগে। রং সাইডে গেলে মামলা খাইতে হয়, সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়, দুই বছর পরপর লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়াতে হয়। আর রিকশার তো খরচ নাই। ওইডায় কইরতে হইব, আর কী করার? এই দেশের যা অবস্থা, মনে হয় না বাইক চালাই বেশি দিন খাওয়া যাইব।’

দেলোয়ার পাঁচ বছর হলো ঢাকা শহরে মোটরসাইকেল চালিয়ে আসছেন। স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে থাকেন রাজধানীর পোস্তগোলায় ভাড়া বাসায়। পোস্তগোলার দিকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য আরও দীর্ঘ লাইন থাকায় তিনি আরামবাগে আসেন তেল কিনতে; কিন্তু এখানেও দীর্ঘ লাইন।

আরামবাগের এই ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলের পাশাপাশি প্রাইভেট কারেরও দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। সে লাইন ফিলিং স্টেশন থেকে ফকিরাপুল মোড় ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

ঢাকার পরীবাগে ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের অপেক্ষায় বসে মোটরসাইকেলগুলো, পাশ দিয়ে যাচ্ছেন এক সাইকেল আরোহী

প্রচণ্ড রোদের কারণে মোটরসাইকেলচালকেরা সড়কে বাইক রেখে পাশে গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নিচ্ছিলেন।

এভাবে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় লাইনে আটকে থাকতে হওয়ায় মোটরসাইকেলচালকদের আয় কমে গেছে। দেলোয়ার বলেন, ‘আমরা রাইডশেয়ার করি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। ৬ ঘণ্টা যদি তেল নিতেই ব্যয় করি, তাহলে সারা দিনে আমরা আর কী কামামু (আয়)। আমাদের অবস্থা খুব খারাপ। এটা সরকারের বোঝা উচিত। যারা রাইডশেয়ার করে, তাদের জন্য একটা ব্যবস্থা করা উচিত।’

দেলোয়ার হোসেন জানান, আগে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা আয় হতো তাঁর। এখন তা অনেক কমে গেছে। তাঁর দাবি, তেলের জন্য তাঁদের ভোগান্তির কথা তো যাত্রীরা শোনে না। ভাড়া একটু বেশি চাইলেও দেয় না। যাত্রীরা বলে যে তেলের দাম তো বাড়েনি।

ঢাকার আরামবাগে জ্বালানি তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ লাইন

কেবল আরামবাগের এইচ কে ফিলিং স্টেশন নয়, রাজধানীর মালিবাগ মোড়ের রাজারবাগ ফিলিং স্টেশন, মতিঝিলের কারিম অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশন, দৈনিক বাংলা মোড়ের বিনিময় ফিলিং স্টেশন, মৎস্য ভবন মোড়ের রমনা ফিলিং স্টেশনেও দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে।

এই ভোগান্তিতে পড়া দেলোয়ারের মতো রাইডারদের এখন পেশায় টিকে থাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।