বৃষ্টি হলে ড্রেন উপচে বিএফডিসি কার্যালয়ও পানিতে থইথই করতে থাকে। সাম্প্রতিক চিত্র
বৃষ্টি হলে ড্রেন উপচে বিএফডিসি কার্যালয়ও পানিতে থইথই করতে থাকে। সাম্প্রতিক চিত্র

বিএফডিসির শুটিং ফ্লোরে বৃষ্টি এখন বিলাস নয়, আতঙ্ক

  • শুটিং ফ্লোর ছিল ৯টি, এখন সচল আছে ৫টি।

  • ফ্লোর ভাড়া দিয়ে মাসে ২০ লাখ টাকা আয় আসে।

  • সংস্কারের জন্য দেড় কোটি টাকা চাইছে কর্তৃপক্ষ।

মরচে ধরা তালা খুলতে বেশ কসরত করতে হলো দুজন কর্মীকে। ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। বাতি জ্বালানোর পরও বলতে গেলে কিছুই দেখা যায় না। চারপাশে ভুতুড়ে পরিবেশ। গত ১৭ জুন ঢাকাই চলচ্চিত্রের মূল কেন্দ্র বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বা বিএফডিসির ৭ নম্বর শুটিং ফ্লোরে গিয়ে দেখা গেল এমন অবস্থা।

অন্য ফ্লোরগুলোর অবস্থাও প্রায় একই। ছাদ বেহাল, দেয়ালে ফাটল। মেকআপ রুমের ড্রেসিং টেবিল আর আয়নায় জমেছে ধুলা। কর্মীরা জানালেন, মুষলধারে ঘণ্টাখানেক বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন ফ্লোরের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। সেদিন অবশ্য বৃষ্টি ছিল না। তবে ৭ জুলাই প্রথম আলোর আলোকচিত্র সাংবাদিক শুভ্র কান্তি দাশ যখন বিএফডিসির ফ্লোরগুলোর ছবি তুলতে গিয়েছিলেন, তখন ছাদ চুইয়ে পড়া পানি দেখা গেল কোনো কোনো ফ্লোরের মেঝেতে। সে পানি যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্যও কর্মীরা নানা কসরত করছিলেন।

সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বিএফডিসির ৭ নম্বর ফ্লোরে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে মেঝে ভেসে যায়। ছবিটি সম্প্রতি তোলা

বিএফডিসিতে ফ্লোরে কর্মরত ব্যক্তিরা বলছেন, সিনেমায় নায়ক–নায়িকারা বৃষ্টিতে ভিজে গানের সঙ্গে নাচেন। তবে এফডিসির কর্মীদের বৃষ্টিবিলাস করার সুযোগ নেই, বরং বৃষ্টি মানেই আতঙ্ক। শুটিংয়ের জন্য যাঁরা ফ্লোরগুলো ভাড়া নেন, তাঁরাও বিরক্ত হন। বৃষ্টিতে শুটিংয়ের জিনিসপত্র নষ্ট হয়। এই বর্ষায় শুধু যে ফ্লোরের ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে, তা নয়; ড্রেন উপচে বিএফডিসি কার্যালয়ও পানিতে থইথই করতে থাকে।

বিভিন্ন ফ্লোরের ছাদ এবং ড্রেনের কিছু অংশ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য গত ৫ এপ্রিল বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে জরুরি ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১ কোটি ৫৭ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা চাওয়া হয়। তবে এ চিঠির পর কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো নেওয়া হয়নি। মাসুমা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে আশ্বাস পাওয়া গেছে। তবে এখনো তেমন কোনো উদ্যোগের কথা জানানো হয়নি।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ে এখন যে বিএফডিসি রয়েছে, তার প্রতিষ্ঠা পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সালে। চলচ্চিত্রশিল্প অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করলে বাইরের স্টুডিওর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ ১১টি সংস্থার জন্য বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিএফডিসির জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। প্রতিষ্ঠানটির চলার কথা নিজস্ব আয়ে, তবে ২০১৪ সাল থেকে সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ বেতারসহ ১১টি সংস্থার জন্য বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বিএফডিসির জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। প্রতিষ্ঠানটির চলার কথা নিজস্ব আয়ে, তবে ২০১৪ সাল থেকে সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ফ্লোরগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিএফডিসিতে মোট ফ্লোর ছিল ৯টি। বিএফডিসির দেওয়া তথ্য বলছে, স্টোর ও মেকআপ রুম ছাড়া শুটিং ফ্লোরগুলোর আয়তন হচ্ছে—১ নম্বর ফ্লোর ২ হাজার ৪০০ বর্গফুট, উচ্চতা ২৫ ফুট। এটি নির্মিত হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে। ষাটের দশকে ২ (মুক্তিযোদ্ধা চিত্রনায়ক জসীম ফ্লোর) ও ৬ নম্বর ফ্লোর নির্মিত হয়েছিল। ১০ হাজার ৯৮ বর্গফুটের ২ নম্বর ফ্লোরের উচ্চতা ৩৫ থেকে ৪০ ফুট। ৩ হাজার ২০০ বর্গফুটের ৬ নম্বর ফ্লোরের উচ্চতা ২৫ ফুট। এটি বর্তমানে লাইট শাখার স্টোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, ফ্লোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। সত্তরের দশকে নির্মিত হয় ৩ হাজার ৪০ বর্গফুট ও ২৫ ফুট উচ্চতার ৭ নম্বর ফ্লোর। আর আশির দশকে নির্মিত হয়েছে ৮ ও ৯ নম্বর ফ্লোর। ৪ হাজার ৯৬০ বর্গফুটের এই দুটি ফ্লোরের উচ্চতা ৩৬ ফুট। ৮ নম্বর ফ্লোর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের কাছে মাসিক ১১ লাখ টাকায় ভাড়া দেওয়া আছে। বর্তমানে শুধু ৭ নম্বর ফ্লোরে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত যন্ত্র-এসি আছে।

৩, ৪, ৫ নম্বর শুটিং ফ্লোর ভাঙা হয়েছিল বিএফডিসি কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের জন্য। বর্তমানে ৬ নম্বর ফ্লোর স্টোর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই হিসেবে এখন কার্যকর ফ্লোর আছে পাঁচটি। এগুলো ভাড়া দিয়ে মাসে ২০ লাখ টাকার মতো আয় আসে বলে বিএফডিসি সূত্র জানিয়েছে। ফ্লোরগুলো দিন ও শিফট অনুযায়ী ভাড়া দেওয়া হয়। এর বাইরে প্যাকেজেও ভাড়া নেওয়ার সুযোগ আছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ২০টি সিনেমার শুটিং হয়েছে এফডিসিতে, মূলত ফ্লোরগুলোতে।

বিএফডিসির আয়ের উৎস হচ্ছে স্পট ভাড়া (সেট নির্মাণ ও শুটিংকালীন)। এই স্পটের মধ্যে বিভিন্ন ফ্লোর ছাড়াও রয়েছে স্টুডিও চত্বর, কড়ইতলা, মাঠ, বাগান, ক্যানটিন, গ্যারেজ, ভবনের ছাদ, স্টল, লবি, করিডর, মেডিক্যাল সেন্টার, ঝরনা স্পট, ভিআইপি প্রজেকশন হল, কালার ল্যাবে শুটিং। কাগজে-কলমে এফডিসির অনেক কাজ। তবে এখন শুটিং ফ্লোর ভাড়া বা কিছু কারিগরি সুবিধা দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান তেমন কাজ নেই। অনেক ‘নেই’–এর মধ্যেও ফ্লোরগুলো প্রতিষ্ঠানটির আয়ের বড় একটি উৎস। কিন্তু সেগুলো এখন বেহাল।

সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বিএফডিসির ৭ নম্বর শুটিং ফ্লোর এখন ব্যবহার হচ্ছে গুদাম হিসেবে

১৭ জুন ৭ নম্বর ফ্লোরের তালা খোলার পর কর্মীরা জানালেন, গত পবিত্র ঈদুল আজহার পর এ ফ্লোরে আর কোনো সিনেমার শুটিং হয়নি। শুটিংয়ের জন্য বাইরে নানা স্থান পাওয়া যাচ্ছে। বিএফডিসিতে যাঁরা আসছেন, তাঁরা মূলত ফ্লোর সুবিধাটুকুর কারণেই আসছেন।

গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর শুটিং হয়েছিল বিএফডিসিতে। একটি ট্রেনযাত্রাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া গল্পের এই সিনেমায় ট্রেন বানিয়ে তাতে শুটিং হয়েছিল। সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর প্রথম আলোকে বলেন, বিএফডিসির এত বড় ফ্লোর পাওয়া না গেলে সিনেমাটিই বানানো সম্ভব হতো না।

তবে এফডিসিতে শুটিং করতে গিয়ে বেশ কিছু সমস্যায় পড়েন তানিম নূর। তিনি বলেন, প্রথম সমস্যায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। ফ্লোরের ভেতরে একটি আছে, সেটি কতজন ব্যবহার করবে? যা–ও আছে, তা পরিচ্ছন্ন না। এ ছাড়া এফডিসির যন্ত্রপাতি অনেক পুরোনো, এগুলো দিয়ে কাজ করা কঠিন। তাই বাইরে থেকে যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে হয়েছে। এতে খরচ বেড়েছে।

প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা বললেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা ব্ল্যাকবোর্ডের সহকারী ব্যবস্থাপক রুবায়েত বিন বাশার। তিনি বলেন, ফ্লোরে প্রচুর গরম। পরিষ্কার না। সব থেকে বড় সমস্যা টয়লেট সমস্যা। তবে এফডিসি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ফ্লোরগুলোর ভাড়া কমিয়েছে। বাইরের শুটিং বাড়ির তুলনায় এখানে কম খরচে শুটিং করা সম্ভব হচ্ছে।

দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো কেপিআই হিসেবে চিহ্নিত করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সরকার। বিএফডিসিও কেপিআইভুক্ত এলাকা। তবে সেখানে প্রায়ই উটকো লোকজন ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রথম সমস্যায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। ফ্লোরের ভেতরে একটি আছে, সেটি কতজন ব্যবহার করবে? যা–ও আছে, তা পরিচ্ছন্ন না। এ ছাড়া এফডিসির যন্ত্রপাতি অনেক পুরোনো, এগুলো দিয়ে কাজ করা কঠিন।
তানিম নূর, চলচ্চিত্র নির্মাতা

সংস্কার ছাড়া ‘চলছে না’

বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান বলেন, বিএফডিসি বহুতল কমপ্লেক্স নির্মাণের প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। তবে নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। নির্মাণকাজ চলায় প্রতিষ্ঠানের আয় আরও কমে গেছে। বর্ষায় বেহাল ফ্লোরগুলো ভাড়া নিতে চান না অনেকে। ২০১৬ সালের পর নতুন কোনো যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি। নির্মাতারা পুরোনো যন্ত্রপাতি ভাড়া নিতে চান না।

আগের মতো ব্যস্ততা নেই শুটিং ফ্লোরগুলোতে, ড্রেসিং টেবিলে ধুলার আস্তরণ তাই বলে দিচ্ছে

পাঁচটি ফ্লোর, ১০টি মেকআপ রুম, আটটি ডিজিটাল ক্যামেরা, পাঁচটি ডিজিটাল সম্পাদনা মেশিন, একটি সাবটাইটেল মেশিন, একটি টেলিসিনে মেশিন, একটি কালারগ্রেডিং মেশিন, দুটি ডিজিটাল শব্দগ্রহণ মেশিন, একটি ডিসিপি মেশিন, তিনটি অপটিক্যাল মেশিন, পাঁচটি প্রেক্ষাগৃহ—মোটা দাগে এই নিয়ে চলছে বিএফডিসি। ল্যাবটি রয়েছে বন্ধ।

২০৩০ সালের মধ্যে বিএফডিসিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র সেবাকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য ঠিক করেছে কর্তৃপক্ষ। সে জন্য বিএফডিসি কমপ্লেক্স তৈরির কাজ চললেও অবকাঠামোগত কাজ হয়েছে মাত্র ৫৩ শতাংশ। কবে নাগাদ তা শেষ হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ৭০ বছরে পা দেওয়া প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলে মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে মাসে গড়ে আয় হয় ৩০ লাখ টাকা। ফলে ঘাটতি থাকছে।

অথচ একসময় অবস্থা বিপরীত ছিল বলে জানান বিএফডিসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) মামুনূর রশীদ, যিনি ২৯ বছর ধরে এখানে কর্মরত। তিনি বলেন, একসময় ফ্লোরগুলোতে তালা লাগানোরই ফুরসত পাওয়া যেত না। প্রায় ২৪ ঘণ্টা কাজ হতো। ফ্লোর বন্ধ করাই মুশকিল হতো। এক দলের কাজ শেষ হওয়ার আগে আরেক দল উপস্থিত হলে অনেক সময় মারামারিও লেগে যেত। নায়ক–নায়িকাদের উপস্থিতি তো ছিলই। ২০০৭-০৮ সাল পর্যন্তও এমন অবস্থা দেখা গেছে।

ঢাকাই চলচ্চিত্রের কেন্দ্রবিন্দু বিএফডিসি এখন ধুঁকছে

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মামুনূর রশীদ বলেন, কাজের চাপে একসময় সারা রাতও বাড়ি ফিরতে পারেননি। আর আগে যাঁরা কর্মরত ছিলেন তাঁদের মুখে শুনেছেন, কেউ কেউ নাকি সাত দিনেও বাড়ি ফিরতে পারতেন না। আর এখন তালা খুলতেই কসরত করতে হয়।

এফডিসির বড় ফ্লোরগুলোর চাহিদা এখনো থাকার বিষয়টি তুলে মামুনূর রশীদ বলেন, এই তো ‘বনলতা এক্সপ্রেস’–এর শুটিং হলো এফডিসিতে। বিশাল বড় একটি ট্রেনই বানানো হলো। শুটিং শেষে সেই ট্রেন সরাতে সে কী অবস্থা! তবে ফ্লোরগুলো সংস্কার-মেরামত না হলে আর চলছে না। আর এফডিসিকে আয় করতে হলে ফ্লোরগুলোই বড় ভরসা।

এফডিসির চিফ অব ফ্লোর অ্যান্ড সেট হিমাদ্রি বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, ২০১১-১২ সালের দিকে ৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের আওতায় ফ্লোরগুলোতে কিছু সংস্কার কাজ হয়েছিল, এরপর আর কোনো কাজ হয়নি।

বিএফডিসি বহুতল কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলছে ২০২২ সাল থেকে

ঐতিহ্য হারিয়ে ধুঁকছে

বিএফডিসির প্রতিষ্ঠা ১৯৫৭ সালে ইস্ট পাকিস্তান ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন হিসেবে। তা এফডিসি নামেই পরিচিতি পায়। এখানে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। অ্যানালগ যুগের ৩৫ মিলিমিটার ফরম্যাটের বিভিন্ন ধরনের কাঁচা ফিল্ম যেমন সাউন্ড নেগেটিভ, পিকচার নেগেটিভ ও পজিটিভ আমদানি করে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কাছে বিক্রি করার একচেটিয়া প্রতিষ্ঠান ছিল বিএফডিসি। রাজ্জাক, শাবানা, রোজিনা, সুচন্দা, আলমগীর, ববিতা, জাফর ইকবাল, সালমান শাহ—এমন নায়ক–নায়িকাদের উপস্থিতিতে একসময় এফডিসির শুটিং ফ্লোরগুলো গমগম করত।

১৯৮৭ সালে এফডিসি থেকে প্রকাশিত অনুপম হায়াৎ-এর ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস’ শিরোনামের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, দেশের পাঁচ শতাধিক (১৯৮৭ সাল পর্যন্ত) প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত সিনেমার মধ্যে শতকরা ৯৮টি সিনেমাই বিএফডিসিতে তৈরি। প্রযোজনা, পরিবেশনা, প্রদর্শনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আড়াই লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে এফডিসি থেকে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা বিনোদন কর পেত সরকার।

বিএফডিসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট-ঘাটতি ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলে মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় মাসে গড়ে ৩০ লাখ টাকা।

তবে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশে দেরি করে পিছিয়ে পড়ে বিএফডিসি। ২০১৪ সালে এখানে প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা আসে। অথচ এর আগে ২০১২ সালে দেশে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে ডিজিটাল চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয়।

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ থেকে ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে মো. রাজিবুল হাসানের ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প: এফডিসির ভূমিকা: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থ। এতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ২০০০ সাল থেকে ঝিমিয়ে পড়তে শুরু করে। আর ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকেই লোকসান গোনার শুরু।

বিএফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা রহমান

এ অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ। সেখানে কর্মীদের বেতন, অবসর-উত্তর সুবিধাসহ প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়নের জন্য ১১৮ কোটি ৭ লাখ টাকা অনুদান/থোক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল।

তাতে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট-ঘাটতি ২০ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানটির কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ মিলে মাসিক ব্যয় ১ কোটি ১০ লাখ টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির আয় মাসে গড়ে ৩০ লাখ টাকা।