
রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানার এল-৭ নম্বর ব্লকের সামনে দর্শনার্থীদের ভিড়। সেই ভিড় ঠেলে কেউ সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, কেউ আবার দূর থেকেই মুঠোফোনে ছবি তুলছেন, ভিডিও করছেন। হঠাৎ ভিড়ের কারণে ছোট ছেলেকে কাঁধে তুলে নিলেন এক বাবা। দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখলেন ছেলের পা। ছেলের হাতে দিলেন মুঠোফোন। দুই হাত দিয়ে মুঠোফোন উঁচিয়ে ধরে ছেলেটি প্রাণপণে চেষ্টা করছিল ভিডিও করার।
সরেজমিন গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে দেখা যায় এমন দৃশ্য। বাবা-ছেলে মিলে চিড়িয়াখানার যে প্রাণীটির ভিডিও করছিল, সেটি বহুল আলোচিত অ্যালবিনো জাতের মহিষ। প্রাণীটি এরই মধ্যে দেশ-বিদেশে ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ নামে পরিচিত পেয়েছে। মহিষটিকে একনজর দেখতে চিড়িয়াখানার ওই ব্লকে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করছেন।
ছেলে টেলিভিশনে মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখেছে। এর পর থেকেই চিড়িয়াখানায় আসার জন্য বায়না ধরেছিল। ঢাকায় ফিরেই ওকে নিয়ে এখানে এসেছি। মহিষটিকে সামনে থেকে দেখে সে খুব খুশি।আবু সুফিয়ান
পরে কথা হয় ওই বাবা-ছেলের সঙ্গে। বাবার নাম আবু সুফিয়ান। ছেলে সাফওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন তিনি। সুফিয়ান বললেন, তাঁরা পরিবারসহ ফিলিপাইনে থাকেন। পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশে এসেছেন। গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটে ঈদ উদ্যাপন করে শুক্রবার ঢাকায় ফিরেছেন। বর্তমানে ধানমন্ডিতে স্ত্রীর বড় বোনের বাসায় থাকছেন। সেখান থেকেই ছেলের আবদার পূরণ করতে চিড়িয়াখানায় নিয়ে এসেছেন।
সুফিয়ান প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছেলে টেলিভিশনে মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেখেছে। এর পর থেকেই চিড়িয়াখানায় আসার জন্য বায়না ধরেছিল। ঢাকায় ফিরেই ওকে নিয়ে এখানে এসেছি। মহিষটিকে সামনে থেকে দেখে সে খুব খুশি।’
সাফওয়ানও বেশ উচ্ছ্বসিত। সে বলল, ‘অনেক ভালো লাগছে। ওর হেয়ার স্টাইলটা একদম ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো।’
মহিষটি ঘিরে দর্শনার্থীদের আগ্রহ যেন একটু বেশিই। সরেজমিন দেখা যায়, কেউ পরিবার নিয়ে এসে ছবি তুলছেন। কেউ আবার শিশুদের দেখিয়ে দিচ্ছেন প্রাণীটিকে। দর্শনার্থীদের অনেকেই বলছিলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা শুনে তাঁরা এটিকে দেখতে এসেছেন।
মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমি টিভিতে দেখেছি। পরে চাচ্চুকে বলেছি, আমি ট্রাম্পকে দেখব। তাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেনসাবিহা ইসলাম
আমিনবাজারের বেগুনবাড়ি এলাকা থেকে চাচা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় এসেছে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী সাবিহা ইসলাম। তবে দূর থেকে শুধু চোখে দেখে মন ভরছিল না। তাই চাচার কাছ থেকে মুঠোফোন চেয়ে নিয়ে মহিষটির ভিডিও করতে যায় সে।
কিন্তু তখন দেখা যায়, ফোনে আর কোনো খালি জায়গা নেই। হাল না ছেড়ে নিজেই ফোনের পুরোনো কিছু ছবি আর ভিডিও মুছে ফেলে সাবিহা। দুই দফা ফাইল মুছে ফেলার পর অবশেষে মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভিডিও করতে পারে সে।
পরে কথা হয় সাবিহার সঙ্গে। সাবিহা জানায়, টেলিভিশনে আলোচিত মহিষটির খবর দেখার পর থেকেই সেটিকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা ছিল ওর।
‘মহিষ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আমি টিভিতে দেখেছি। পরে চাচ্চুকে বলেছি, আমি ট্রাম্পকে দেখব। তাই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছেন,’ বলছিল সাবিহা।
তবে দূর থেকে মহিষটিকে দেখে আর ভিডিও করেও পুরোপুরি খুশি হতে পারেনি সাবিহা। ইচ্ছা ছিল ব্লকের ভেতরে গিয়ে প্রাণীটিকে আরও কাছ থেকে দেখার। একপর্যায়ে সে চাচার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চাচ্চু, ভেতরে যাব।’
জবাবে সাবিহার চাচা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘ওখানে তো যাওয়া যাবে না।’
চিড়িয়াখানার বিভিন্ন প্রাণীর খাঁচার সামনে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ সিংহ, হাতি কিংবা জিরাফ দেখায় ব্যস্ত।
চিড়িয়াখানায় উপচে পড়া ভিড়
এবারের ঈদের ছুটিতে রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় দেখা যাচ্ছে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, চিড়িয়াখানা থেকে প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার দূরে রাইনখোলা মোড় থেকে যানজট লেগে আছে। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে হেঁটে চিড়িয়াখানার দিকে রওনা হয়েছেন।
প্রবেশপথে পৌঁছে দেখা গেল, টিকিট কাউন্টারের সামনে দীর্ঘ সারি। শিশুদের হাত ধরে বা কাঁধে তুলে নিয়ে অপেক্ষা করছেন অভিভাবকেরা। কেউ ছাতা মাথায়, কেউ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। পরিবারের কোনো সদস্য গেছেন টিকিট সংগ্রহ করতে। নানা বয়সী মানুষের পদচারণে চিড়িয়াখানার ভেতরের প্রায় সব পথই ছিল মুখর।
চিড়িয়াখানার বিভিন্ন প্রাণীর খাঁচার সামনে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ বাঘের খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ সিংহ, হাতি কিংবা জিরাফ দেখায় ব্যস্ত। শিশুরা কৌতূহল নিয়ে নানা প্রাণী পর্যবেক্ষণ করছে। কেউ আবার হাত বাড়িয়ে প্রাণীদের ডাকাডাকির চেষ্টা করছে।
অনেককে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি তুলতেও দেখা গেল। পরিবারসহ গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন অনেকে। আবার কেউ চাদর বা মাদুর বিছিয়ে বসেছেন। কেউ আবার সবুজ ঘাসের ওপর গোল হয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন। কেউবা বাসা থেকে খাবার রান্না করে এনে সেখানে খাচ্ছিলেন।