
সাদা-ক্রিম রঙের লোমশ বিড়ালটি বারবার মাথা ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিল চারপাশে। গোল মুখ, চ্যাপ্টা নাক, বড় চোখ আর শরীরজুড়ে লম্বা নরম লোম। বিড়ালটিকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন বিক্রেতা শাহ আলম। তাঁর সামনে খাঁচার মধ্যে একই ধরনের আরও কয়েকটি বিড়াল রয়েছে। তবে এই বিড়ালের দামই সবচেয়ে বেশি বলে জানালেন বিক্রেতা। কেউ দাম জিজ্ঞাসা করতেই তাঁর উত্তর, ‘৪০ হাজার টাকা’।
আজ শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী মাজার এলাকায় পোষা প্রাণীর হাটে চোখে পড়ে এমন চিত্র। সপ্তাহে এক দিন শুক্রবার বসে এই হাট। চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা জড়ো হন এই হাটে।
বিক্রেতা শাহ আলম জানালেন, তিনি মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। ১৪ বছর ধরে বিড়াল লালন-পালন করেন। প্রতি সপ্তাহেই মিরপুরের হাটে বিড়াল বিক্রি করতে আসেন। বিড়ালের দাম এত চাওয়া হচ্ছে কেন জানতে চাইলে বলেন, বিড়ালটি পার্সিয়ান জাতের। এর বাবা-মা দুটিই পার্সিয়ান। মুখের গঠন ও ঘন লোমের কারণে এর দাম বেশি।
তবে ওই একই হাটে পার্সিয়ান বিড়াল বিক্রি হচ্ছে আরও কম দামে। যেমন উত্তরা থেকে এক জোড়া পার্সিয়ান বিড়াল এনেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মো. নাফিস। এক বছর বয়সী দুটি বিড়ালের দাম চাইছেন দশ হাজার টাকা।
আবার একই জাতের বিড়ালের তিন মাস বয়সী বাচ্চা হাটে এনেছেন মো. জুয়েল। প্রতিটির দাম চাইছেন ১৩ হাজার টাকা।
মিরপুরের পোষা প্রাণীর হাট ঘুরে দেখা যায়, শাহ আলী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের সড়কের কয়েক কিলোমিটারজুড়ে সারি সারি খাঁচা। কোথাও রঙিন টিয়া, কোথাও ককাটিয়েল, লাভবার্ড, বাজিগর। বিক্রি হচ্ছে কবুতর, খরগোশ, কুকুরও। হাটে জায়গা পেয়েছে চীনা হাঁস, দেশি মুরগি, কোয়েল, তিতির, টার্কিসহ আরও নানা ধরনের পাখি ও প্রাণী।
মানুষের ভিড়ের মধ্যে কোথাও চলছে পাখির দরদাম, কোথাও বিড়াল হাতে নিয়ে দেখছেন ক্রেতা। আবার কেউ খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু ছবি তুলছেন ও ভিডিও করছেন।
হাটে আসা বিক্রেতাদের অনেকেই দীর্ঘদিন এই ব্যবসা করছেন। আবার কেউ কয়েক মাস আগে শুরু করেছেন। অনেকের এই হাটেই দোকান আছে। আবার অনেকে শখের বশে বাসায় পাখি পালন করেন, পরে হাটে এসে বিক্রি করছেন।
হাটে আসা বিক্রেতাদের অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন। তেমনই একজন নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা মো. আরিফ। তিনি এনেছেন লাভবার্ড ও বাজিগর পাখি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০-১২ বছর ধরে এই হাটে আসছি।’ পাখির ব্যবসার বড় একটি অংশ এখন অনলাইনেই হয়। তবে সরাসরি হাটে এসে বিক্রির সুযোগটি কাজে লাগাতে চান তিনি।
লাখ টাকার টিয়া
বিড়ালের খাঁচা পার হয়ে একটু সামনে যেতেই বদলে যায় দৃশ্য। চারপাশে তখন পাখির কিচিরমিচির। হাটে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে রঙিন টিয়া আর ককাটিয়েল। ককাটিয়েলের জোড়ার দাম চাওয়া হচ্ছে আড়াই থেকে ৪ হাজার টাকা। বয়স ও রংভেদে লাভবার্ড বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায়।
বিভিন্ন বয়সী ককাটিয়েল নিয়ে হাটে এসেছেন মিরপুরের বাসিন্দা শান্তা। তাঁর সামনে বেশ কয়েকটি ককাটিয়েল খাঁচার বাইরেই রাখা। সেগুলো বিভিন্ন খেলা দেখাচ্ছে। তাই দেখতে ভিড় জমাচ্ছে মানুষ।
শান্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর পাখির খামার রয়েছে। অনলাইনেও পাখি বিক্রি করেন। চার-পাঁচ বছর ধরে হাটে আসছেন। বিক্রিও বেশ ভালো হয়।
হাটে লাল, সাদা, হলুদ ও ভায়োলেট রিংনেক টিয়া নিয়ে এসেছেন মিরপুরের রূপনগর এলাকার বাসিন্দা কাসফিয়া নওশিন। সঙ্গে তাঁর ৯ বছরের মেয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ১৯ বছর ধরে পাখি পালেন। আর ২০২১ সাল থেকে মিরপুরের হাটে আসেন।
কাসফিয়ার আনা পাখিগুলোর মধ্যে ভায়োলেট টিয়ার দাম সবচেয়ে বেশি। প্রতি জোড়ার দাম চাওয়া হচ্ছে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সাদাগুলো ৪০ হাজার এবং অন্য রঙেরগুলো ৩৫ হাজার টাকা।
কবুতরের সঙ্গে আছে বাহারি মুরগিও
টিয়ার খাঁচার পরেই দেখা যায় নানা জাতের কবুতর। রেসার, জালালি, দেশি, গিরিবাজ, ম্যাগপাইসহ বিভিন্ন জাতের কবুতর রয়েছে হাটে। ম্যাগপাই জাতের এক জোড়া কবুতরের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ হাজার টাকা।
তবে হাটটি শুধু পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারি ধরে রাখা খাঁচায় রয়েছে হাঁস-মুরগি, কোয়েল, তিতির ও টার্কি। ছোট ছোট খাঁচায় থাকা পাখি ও মুরগিগুলো ঘিরেও ক্রেতা-দর্শনার্থীদের কৌতূহল। চীনা হাঁসের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা জোড়া। কোয়েল পাখির জোড়া ৯০ টাকা। আর ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা প্রতিটি ৩০ টাকা।
গাজীপুর থেকে বাহারি জাতের মুরগি নিয়ে হাটে এসেছেন আবু হানিফ। তাঁর খাঁচায় রয়েছে জাপানি সিল্কি মুরগি, সেব্রাইট, টাইগার ও ফাইটার। একটি জাপানি সিল্কি মুরগির দাম তিনি চাইছেন ৪ হাজার টাকা। সেব্রাইটেরও প্রতিটির দাম ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। ফাইটার মুরগির একেকটির দাম ৩ হাজার টাকা।
ফাইটার মুরগির এত দাম কেন এবং কারা এসব মুরগি কেনেন—জানতে চাইলে আবু হানিফ বলেন, লড়াইয়ের জন্য এসব মুরগির সুনাম আছে।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিরপুরের এই পোষা প্রাণীর হাটের বয়স নেহাত কম নয়। কেউ ১০ বছর ধরে হাট দেখছেন। আবার কেউ ২০ বছর আগের কথা বলছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মিলন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধইরা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর থেইকা হাটে লোক বেশি আহে। তয় হেরা তো ক্রেতা না। বেশির ভাগই আইসা ভিডিও কইরা যায়গা।’