ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নিতে এক পাশে গাড়ি, আরেক পাশে মোটরসাইকেলের সারি। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার চিত্র
ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নিতে এক পাশে গাড়ি, আরেক পাশে মোটরসাইকেলের সারি। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার চিত্র

জ্বালানি পরিস্থিতি

ঢাকা-সাভারের ছয় পাম্প ঘুরে সপ্তমটায় পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষায় চালক আবদুর রহমান

ভাড়ায় চালানো নোয়া এস্কোয়ার মডেলের গাড়ির চালক আবদুর রহমান। আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে রাজধানীর জিয়া উদ্যান ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার মাঝখানের লেক রোডে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাঁদের বাসা সাভারের হেমায়েতপুরে। তখন তাঁদের গাড়িটি লেকের মাঝামাঝি সেতুর কাছাকাছি অবস্থান করছিল।

ওই সড়কে দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনগুলো আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নেওয়ার অপেক্ষায়। আবদুর রহমানও ওই পাম্প থেকেই তেল কিনতে অপেক্ষা করছেন। তিনি জানান, সকাল ১০টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

আবদুর রহমান বলেন, সকাল সাতটার দিকে হেমায়েতপুরের বাসা থেকে বের হন তিনি। প্রথমে হেমায়েতপুরের লালন ও কফিল ফিলিং স্টেশন বন্ধ পান। এরপর ঢাকায় এসে টেকনিক্যাল, মিরপুর ১০ ও মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের আরও তিনটি পাম্পে যান। প্রথম পাম্পে আধা ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে জানতে পারেন তেল শেষ। পরের দুটি পাম্পেও প্রায় এক ঘণ্টা করে অপেক্ষার পরও তেল পাননি। পরে বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দীর্ঘ লাইন দেখে আর দাঁড়াননি। সেখান থেকে আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনের লাইনে দাঁড়ান। তখন থেকে টানা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা একই জায়গায় অপেক্ষা করছেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আবদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘যদি তেল না থাকে, তাইলে সব গাড়ি বন্ধ কইরা দিক। এক হাজার টাকার তেল দেয়, ঘুরতে ঘুরতেই এক হাজার টাকার তেল শেষ। ওই দিন আমি গাড়ি রাইখা প্রায় তিন ঘণ্টা দূরে যাইয়া পাঁচ লিটার তেল আইনা, পায়ে ধইরা তেল আইনা গাড়ি ইস্টার্ট কইরা বাসায় গেছি। তার চাইতে গাড়ি বন্ধ রাহেন। কাউরে তেল দিয়েন না আপনারা। ...যহন ভরপুর তেল হবে, তহন সবাইরে দিয়েন।’ আগামীকাল সকালে বিমানবন্দর থেকে নোয়াখালীতে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।

আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে গাড়িতে জ্বালানি তেল নিতে পাঁচ ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় আছেন চালক আবদুর রহমান। আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে রাজধানীর জিয়া উদ্যান এলাকায়

আজ বেলা দেড়টার দিকে জিয়া উদ্যান–সংলগ্ন বিজয় সরণি মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, ওই মোড় থেকে ব্যক্তিগত যানবাহনের সারির শুরু। এসব যানবাহন তেল নেবে পৌনে দুই কিলোমিটার দূরের আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে। ওই সময় বিজয় সরণি মোড় থেকে তালুকদার ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক ব্যক্তিগত যানবাহনকে তেলের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

ওই পাম্প থেকে তেল নিতে মোটরসাইকেলচালকদের সারিও পাম্পের সামনে থেকে শুরু করে গণভবন মোড় হয়ে লেক রোডের দিকে পৌনে এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত দেখা যায়। এ সময় তিন শতাধিক মোটরসাইকেলচালককে তেলের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

আজ ভোর চারটায় গাড়ি নিয়ে তেলের জন্য অপেক্ষায় থাকা চালকদের সারিতে দাঁড়ান আবদুল কুদ্দুস। তখন সারির শেষটা ছিল বিজয় সরণি মোড়ে। দুই ঘণ্টায় তিনি প্রায় গণভবন মোড়ের কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। কিন্তু সকাল ছয়টার দিকে তেল দেওয়া বন্ধ করে পাম্প কর্তৃপক্ষ। এরপর রাস্তাতেই গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি।

রাজধানীর আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল দেওয়া হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার বিকেলের চিত্র

সকালে আর নাশতা করা হয়নি কুদ্দুসের। বেলা সোয়া তিনটার দিকে যখন কুদ্দুসের সঙ্গে কথা হয়, তখন তিনি গাড়ির পেছনের ব্যাক ডালা খুলে দিয়ে সেখানে বসে খাবার খাচ্ছিলেন। জানালেন মালিকের বাসা থেকে দুপুরের খাবার পাঠানো হয়েছে।

আবদুল কুদ্দুসের কথায়ও আক্ষেপ। বললেন, ‘এই দেশের জনগণেরে যে সরকার আয়ে সেই পেদায় খায়। মানে জনগণের কোনো দাম নাই, এইডা হইল বড় কথা। আর এই দেশে জন্ম হওয়াডা হইল সবচাইতে বড় ভুল।’

তেলসংকটের কারণে আয়রোজগার কমে গেছে বলে জানান রাইড শেয়ারের চালকেরা। কারণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাঁদের। এতে সময় নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি তেল নিতেই ক্লান্ত হচ্ছেন চালকেরা। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে খরচ কমাতে নিজের পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন বলেও জানালেন।

এমন একজন রাইড শেয়ারের চালক জিয়াউর রহমান। কথা বলে জানা গেল, মোহাম্মদপুরে এক কক্ষের বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন। তাঁদের এক মেয়ে ঢাকার একটি হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করছে। ভেবেছিলেন, ঈদের পর পরিস্থিতি বদলাবে। কিন্তু সে রকম না হওয়ায় ঈদের পর স্ত্রীকে ঢাকায় এনেও গত ৩০ মার্চ গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছেন, বাসাও ছেড়ে দিয়েছেন।

জিয়াউর রহমান বলেন, ‘আমি বাসা নিয়ে ঢাকা থাকতাম। ঈদের পরও আমার ফ্যামিলিকে নিয়ে আসি। আবার ৩০ তারিখে বাড়িতে পাঠিয়ে দিসি। ওই বাসা ছাড়ে দিসি। এর পর থেকে আমি মেসে উঠসি।’

তেলসংকটের কারণে পয়লা বৈশাখের ছুটির দিনেও দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চালকেরা। কারণ, তেল নিতে যে সময় লাগে, অন্যান্য দিন কাজ ফেলে তেলের লাইনে গাড়ি দাঁর করিয়ে রাখা সম্ভব হয় না।

রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নিতে অপেক্ষমাণ মোটরসাইকেলের সারি চলে গেছে মোহাম্মদপুরের টাউন হল এলাকা ছাড়িয়ে। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আসাদ গেট এলাকার চিত্র

প্রাইভেট কারের চালক মজিবর হক বলেন, ‘আজকে তো ছুটির দিন ছিল। কিন্তু গাড়িতে তেল নিতে হবে। তাই ছুটির দিনটাও এভাবে যাচ্ছে। আজ পয়লা বৈশাখের দিন। এখন কী করব? মালিকের দিকটাও দেখতে হয়। ডিউটি অবস্থায় তো হয় না।’ সকাল ছয়টার দিকে তিনি লাইনে দাঁড়ান। ৯ ঘণ্টা পর বেলা সোয়া তিনটার দিকে মজিবরের গাড়িটি আরও প্রায় ৫০টি গাড়ির পেছনে ছিল।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বিমল কৃঞ্চ মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজকে আমরা ৯ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল দিয়ে বিক্রি শুরু করেছি। বেলা আড়াইটার দিকে বিক্রি শুরু করা হয়। এটা গতকালের ডিজেল। যতক্ষণ তেল আছে বিক্রি চলবে। বাইকে ফুয়েল পাস যাঁদের আছে, তাঁদের ৭০০ টাকার এবং যাঁদের ফুয়েল পাস নেই, তাঁদের ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। আর প্রাইভেট কারে ১০০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা তেল দেওয়া হচ্ছে।’