
ছেলেকে টিকা দিতে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন মিরপুরের বাসিন্দা তুহিন খান। তাঁর ছেলে তাহান খানের বয়স ১৬ মাস। তুহিন খান বলেন, ‘আগের ও বর্তমান পরিস্থিতির কোনো মিল নেই। এখন পুরাই ভাঙাচোরা, ময়লা। আগে কত সুন্দর ছিল জায়গাটা। আমরা এসে কত সুন্দর সেবা পেতাম। সেই জায়গা ধ্বংস করে দেওয়া হলো।’
হামলার পর গত শনিবার ছেলেকে টিকা দিতে এসে ভিড়, ধুলাবালু ও অনিরাপদ পরিবেশ দেখে ফিরে গিয়েছিলেন বলে জানান তিনি। তুহিন বলেন, ‘ভাবছিলাম টিকা দিতে পারব না। আজ এসে মোটামুটি ভালো পরিবেশ পেলাম। আজ টিকাও দিলাম।’
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে আজ মঙ্গলবার একটি কক্ষ পরিষ্কার করে সেখানে সীমিত পরিসরে টিকাদান ও প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ওই কক্ষে বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে একটি সিলিং ফ্যান লাগানো হয়েছে। অন্যান্য কক্ষও পরিষ্কার করা হয়েছে এবং সেখানেও বিদ্যুতের সংযোগ দিয়ে পাখা বসানো হয়েছে। তবে এখনো পানির সংযোগ চালু হয়নি। শৌচাগারও পুরোপুরি মেরামত করা হয়নি। ফলে স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর মতো পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। পেছনের দিকে একটি বারান্দায় ইটের গাঁথুনি দিয়ে দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চললেও ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন এখনো স্পষ্ট।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের পর কেন্দ্রটির বিভিন্ন স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়। হামলার পর শনিবার থেকে সীমিত পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম দুই দিন সড়কের পাশে ত্রিপল টানিয়ে টিকা দেওয়া হলেও সোমবার থেকে কেন্দ্রের একটি ভাঙা কক্ষের ভেতরে টিকাদান শুরু হয়।
আজ কেন্দ্রটিতে আগের কয়েক দিনের তুলনায় উৎসুক মানুষের ভিড়ও কিছুটা কম দেখা গেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, প্রথম দিন কেন্দ্রের বাইরে বসে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে হয়েছিল। এখন কেন্দ্রের অবশিষ্ট অবকাঠামোর মধ্যেই সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হচ্ছে। একটি কক্ষ প্রস্তুত করা সম্ভব হয়েছে। সেখানে সরকারি টিকাদান কর্মসূচির টিকা এবং হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রয়োজন হয় না, সেসব সেবাও সীমিত পরিসরে দেওয়া যাচ্ছে।
তবে গর্ভবতী মায়েদের সেবা, প্রসব-পরবর্তী সেবা, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও পুষ্টিসেবা পুরোপুরি চালু করতে হলে অবকাঠামো সংস্কার জরুরি উল্লেখ করে নাসরিন আখতার বলেন, এসব সেবা চালু করতে হলে রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে পানি, বিদ্যুৎ ও শৌচাগারের মতো মৌলিক সুবিধাগুলোও পুরোপুরি চালু করতে হবে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তাঁদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী কেন্দ্রটির অবশিষ্ট স্থাপনা সংস্কার করে কাজের উপযোগী করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। নাসরিন আখতার বলেন, ‘ওনারা দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করেছেন। আজকের মধ্যে পানি ও বিদ্যুতের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন। শৌচাগারের কাজও শুরু হয়েছে। এখন আমরা আশা রাখি, এগুলো হয়ে যাবে।’
পুরো অবকাঠামো সংস্কার হলে আগের মতো বিস্তৃত পরিসরে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন নাসরিন আখতার।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না আজ বেলা ১১টার দিকে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এটি শুধু ভাঙচুরের ঘটনা নয়; স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বিভিন্ন জিনিসপত্রও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একটি হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সামগ্রী থেকে শুরু করে ইট, কাঠ, সিমেন্ট ও রড—সবকিছু লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটতে পারে এবং এটি রাষ্ট্রের জন্য কী ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি করছে?
মান্না অভিযোগ করে বলেন, হামলাকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভাঙচুর চালালেও কাছাকাছি থাকা পুলিশ সময়মতো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি বলেন, তাঁকে জানানো হয়েছে, ৯৯৯ নম্বরে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি।
মান্না বলেন, ‘কারা করেছে, কারা এর সঙ্গে যুক্ত—পুরো বিষয় বের করতে হবে।’ তিনি ঘটনাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকেও ঘটনাটির ওপর নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলাকে শুধু সম্পত্তি দখলের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মান্না। তিনি বলেন, যদি এটি শুধু সম্পত্তি দখলের ঘটনা হয়, তাহলে এত বড় একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এমন হামলা কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারল, সেটিও তদন্তের বিষয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, কোথাও কোনো স্থাপনা বা জমি নিয়ে বিরোধ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই।