মিস্ত্রি শাহ আলম মিরপুর-১০ নম্বরের ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে ভ্যানের চাকা মেরামত করছেন। ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৬
মিস্ত্রি শাহ আলম মিরপুর-১০ নম্বরের ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতে ভ্যানের চাকা মেরামত করছেন। ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৬

মিরপুর হোপ মার্কেট

উচ্ছেদে সম্বল হারানো সেই শাহ আলম কাজে ফিরলেন

রিকশা–ভ্যান মেরামতের মিস্ত্রি শাহ আলম। শনিবার বিকেলে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-১০ কার্যালয়ের সামনে ফুটপাতের গাছের ছায়ায় বসে ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ আগেই একটি ভ্যানের সামনের চাকা মেরামতের জন্য খুলেছেন। কাজ শেষে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলেন।

শাহ আলমের পাশে পড়ে ছিল কাঠের পুরোনো একটি বাক্স। গত বুধবারের উচ্ছেদ অভিযানের সময় ভেঙে গিয়েছিল বাক্সটি। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল এর ভেতরে থাকা রিকশা, ভ্যান ও সাইকেল মেরামতের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। সেই ভাঙা বাক্সই জোড়াতালি দিয়ে আবার ব্যবহার করছেন শাহ আলম। ভেতরে নতুন করে কেনা সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ, চাকার টিউবসহ নানা সরঞ্জাম।

কয়েক দিন আগেও এই জায়গায় বসে আবার কাজ করতে পারবেন, তা ভাবতে পারেননি শাহ আলম। উচ্ছেদ অভিযানে কাজের বাক্সসহ সব সরঞ্জাম হারিয়ে তখন মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন তিনি। এখন সেই বাক্সের পাশে বসেই আবার রিকশা-ভ্যান সারানোর কাজ করছেন।

আমি চাইসিলাম বাক্সটা সরাইয়া হালাই। পরে দেহি আমার বাক্স সহকারে ভাইঙ্গা দিতাসে। আমি বাক্স বাচাইতে গেসি। আমারে চার-পাঁচজন পুলিশ টাইনা নিয়ে গেসে
শাহ আলম, রিকশা-ভ্যান মেরামতের মিস্ত্রি

উচ্ছেদ অভিযানের দিনের কথা বলতে গিয়ে শাহ আলম বলেন, ওই দিন পুলিশ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরে একটি ভবনে আগুন ধরে যায়। পুলিশ সরে যাওয়ার পর দুপুরের দিকে প্রায় দেড় ঘণ্টা সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে বুলডোজার ও সিটি করপোরেশনের গাড়ি আসে।

শাহ আলম বলেন, ‘আমি চাইসিলাম বাক্সটা সরাইয়া হালাই। পরে দেহি আমার বাক্স সহকারে ভাইঙ্গা দিতাসে। আমি বাক্স বাঁচাইতে গেসি। আমারে চার-পাঁচজন পুলিশ টাইনা নিয়ে গেসে। এহানদিয়া আমার মালসামানা, বাক্স ভাইঙগা যা ছিল সব লইয়া গেসে।’

পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার পর ফিরে এসে দেখেন, তাঁর বাক্সটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। শাহ আলম বলেন, ‘আমি মাথায় হাত দিয়া বইসা আসি আর কানতাসি। কী করমু, আমি নিরীহ মানুষ। আমি তো আর ফুটে দোকান করি না। রোডে দোকান করি, রিকশা সাইকেলের কাম করি। এ ছাড়া আমার আর কিছু নাই।’

শাহ আলমের সংসার চলে রিকশা–ভ্যান মেরামত করে। পাঁচ-ছয়জনের খাবারের জোগান দিতে হয় এই আয় দিয়ে। ঢাকা, ৩ অক্টোবর ২০২৬

একাই সংসারের জোগান

শাহ আলমের বয়স ৭৫ বছর। তাঁর ভাষ্য, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে ঢাকায় আসেন। এরপর থেকেই রিকশা, সাইকেল ও ভ্যান মেরামতের কাজ করে আসছেন। সংসারে পাঁচ-ছয়জনের খাবারের জোগান তাঁকেই দিতে হয়।

শাহ আলম থাকেন মিরপুরের বাইশটেকি আয়না মসজিদ এলাকায়। তাঁর সঙ্গে থাকেন দ্বিতীয় স্ত্রী, বড় মেয়ে ও দুই নাতি। ছোট মেয়ে থাকেন গ্রামের বাড়িতে। প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন।

নিজের আয় সম্পর্কে শাহ আলম বলেন, ‘এইটা ঠিক নাই। কাজের ওপরে নির্ভর করে। ৩০০, ৪০০, কোনো দিন ঠেইলা–মেইলা ৫০০।’

উচ্ছেদে কাজের সরঞ্জাম হারানোর পর নতুন করে কাজ শুরু করা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ, চাকার টিউবসহ প্রয়োজনীয় কিছু মালপত্র নতুন করে এনেছেন। ভাঙা বাক্সটিও মেরামত করেছেন। বাকি সরঞ্জামগুলোও ধীরে ধীরে কেনার পরিকল্পনা করছেন।

উচ্ছেদে কাজের সরঞ্জাম হারানোর পর নতুন করে কাজ শুরু করা তাঁর জন্য সহজ ছিল না। সেলাই রেঞ্চ, হাতুড়ি, ডাল রেঞ্চ, চাকার টিউবসহ প্রয়োজনীয় কিছু মালপত্র নতুন করে এনেছেন। ভাঙা বাক্সটিও মেরামত করেছেন। বাকি সরঞ্জামগুলোও ধীরে ধীরে কেনার পরিকল্পনা করছেন।

ফেসবুকে দেখে খোঁজ

উচ্ছেদ অভিযানে শাহ আলমের কাজের সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নজরে আসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানের।

প্রশাসকের সহকারী একান্ত সচিব আল-আমীন আলম প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃদ্ধের ঘটনাটি তাঁদের নজরে আসে। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে গত বৃহস্পতিবার শাহ আলমকে খুঁজে বের করা হয়। তাঁকে নগর ভবনে ডেকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন প্রশাসক।

আল-আমীন বলেন, শাহ আলম প্রশাসককে জানিয়েছিলেন, তিনি ২০ হাজার টাকা ঋণ করে রিকশা–ভ্যান মেরামতের কিছু নতুন সরঞ্জাম কিনেছিলেন। উচ্ছেদ অভিযানে তাঁর পুরোনো সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পর নতুন করে কাজ শুরু করতে সমস্যায় পড়েছিলেন। পরে প্রশাসক তাঁকে ২০ হাজার টাকা সহায়তা দেন।

রাস্তার পাশে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করে কাজ করার জন্য শাহ আলমকে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান আল-আমীন।

আজ বিকেলে ভ্যানের চাকা মেরামতের কাজ করতে করতে শাহ আলম বলছিলেন, কাজ না করে থাকার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, এই কাজের ওপরই তাঁর সংসার চলে। কথা শেষ করে আবার কাজে নেমে পড়েন তিনি। খোলা চাকার রিং হাতে তুলে নিয়ে নতুন করে মেরামতের কাজ শুরু করেন।