জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও বাস মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন দামে বাসের টিকিট বিক্রি হচ্ছে।
আজ রোববার সকালে রাজধানীর সায়েদাবাদ আন্তজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানির বাস কাউন্টারগুলোতে আগের চেয়ে বেশি দামে টিকিট বিক্রি করতে দেখা যায়।
তবে কাউন্টারে নতুন ভাড়া নির্ধারণের তালিকা না থাকায় কয়েকজন যাত্রী ভাড়া নিয়ে নানা প্রশ্ন করছেন। এ নিয়ে কাউন্টারে দায়িত্ব পালনকারী টিকিট বিক্রেতা ও যাত্রীদের সঙ্গে তর্কাতর্কিও করতে দেখা গেছে।
গত শুক্রবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ৩৪ টাকা থেকে ৪৬ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারে ৩৪ টাকা বাড়িয়ে ১১৪ টাকা, অকটেনের দাম লিটারে ৪৬ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রলের দাম লিটারে ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা করা হয়েছে।
এরপর গতকাল শনিবার রাতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। বনানীতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) প্রধান কার্যালয়ে পরিবহন মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণী কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ১ টাকা ৮০ পয়সার জায়গায় ২ টাকা ২০ পয়সা হবে। এ ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়ছে কিলোমিটার প্রতি ৪০ পয়সা, অর্থাৎ ২২ দশমিক ২২ শতাংশ।
সায়েদাবাদে গিয়ে দেখা যায়, হানিফ পরিবহনের ঢাকা থেকে সিলেটের বিভিন্ন গন্তব্যের ভাড়া আগের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর মধ্যে ১০০ টাকা বেড়েছে মৌলভীবাজার ও শায়েস্তাগঞ্জের ভাড়া।
মৌলভীবাজারের ভাড়া ৪৭০ থেকে বেড়ে ৫৭০ টাকা আর শায়েস্তাগঞ্জের ভাড়া ৪৩০ থেকে বেড়ে ৫৩০ টাকা হয়েছে। ১৩০ টাকা বেড়ে সিলেটের ভাড়া এখন ৭০০ টাকা। এই রুটে সবচেয়ে বেশি, ২০০ টাকা বেড়েছে সুনামগঞ্জের ভাড়া। প্রতি সিটের ভাড়া নিচ্ছে ৮৫০ টাকা। যদিও কিলোমিটারে ২ টাকা ২০ পয়সা বাড়তি হিসাবে এই গন্তব্যের ভাড়া হয় প্রায় ৮০০ টাকার কাছাকাছি।
এ বিষয়ে টিকিট বিক্রেতা অজয় চন্দ্র শীল প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির চূড়ান্ত তালিকা তাঁদের কাছে আসেনি। তবে মালিকপক্ষ যেভাবে বিক্রি করতে বলেছে, সেভাবেই বিক্রি করছেন। বেশি নাকি কম, এ নিয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান।
সিলেট এলাকার শায়েস্তাগঞ্জের প্রতি সিটের নতুন ভাড়া শ্যামলী পরিবহনে ৫০০ টাকা। এটি হানিফ পরিবহন থেকে ৩০ টাকা কম। যদিও এ দুই পরিবহনের আগের ভাড়া একই ৪৩০ টাকায় ছিল।
শ্যামলী পরিবহনে সিলেট ও সুনামগঞ্জের ভাড়ায় ৫০ টাকা কমে, সিলেট ৬৫০ ও সুনামগঞ্জের প্রতি সিটের ভাড়া ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সায়েদাবাদে শ্যামলী পরিবহনের ১ নম্বর কাউন্টারের মাস্টার শিমুল চন্দ্র রায় বলেন, আগে থেকেই ওদের (হানিফ পরিবহন) চেয়ে আমাদের ভাড়া ২০-৩০ টাকা কম। এবারও কিছু কম বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার্থেই এটি করা হয়েছে।
হানিফ পরিবহনে সুনামগঞ্জের টিকিট ৮৫০ টাকায় কেনেন শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোন গন্তব্যে দূরত্ব কত, নতুন ভাড়া কত—এসব তালিকা দেওয়া হয়নি। ভাড়া বৃদ্ধির যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে অনুযায়ী সুনামগঞ্জের ভাড়া হবে ৭৯৫ টাকার মতো। কিন্তু নিচ্ছে ৮৫০ টাকা।
বরিশাল ও পটুয়াখালী রুটের ভাড়াও বেড়েছে ঈগল পরিবহনে। তবে তারা কুয়াকাটার ভাড়া আগের দামেই রাখছে। এই বাসে বরিশালের ভাড়া ১০০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৫৫০ টাকা। ৫০ টাকা বেড়ে পটুয়াখালীর প্রতি সিটের টিকিট বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। তবে কুয়াকাটার ভাড়া ৭০০ টাকায় বিক্রি করছে।
ঈগল পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার মো. মজনু প্রথম আলোকে বলেন, ভাড়া বৃদ্ধির তালিকা হাতে এখনো পাইনি। তবে জ্বালানি খরচের হিসাবে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, বরিশাল যেতে তাঁদের গাড়ির প্রায় ৮০ লিটার জ্বালানি (ডিজেল) লাগে। এতে আগের দামে খরচ হতো ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এখন লাগছে ৯ হাজার ৫০০ টাকা। এক ট্রিপে ২০০০ হাজার টাকা বেশি লাগছে। এ ছাড়া বাসের অন্য খরচ আছে। একটি বাসে গড়ে ২৫ জন যাত্রী হিসাব করে আপাতত ১০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু তাতে চলে না।
সায়েদাবাদের স্টার লাইন পরিবহনের একজন চালকের সহকারী সুমন মিয়া বলেন, ডিজেলের দাম বেড়েছে। সরকার শুধু জ্বালানির ব্যয় ধরে বাসের ভাড়া বাড়িয়েছে। কিন্তু তাতে বাসের ভাড়া কিছুটা বাড়লেও আমাদের পারিশ্রমিক বাড়েনি। হয়তো বাড়বেও না।
স্টার লাইন পরিবহনে ফেনীর ছাগলনাইয়ার ভাড়া ৩৫০ টাকা থেকে ৪২০ টাকা করা হয়েছে। ফেনীর ভাড়া ৬০ টাকা বাড়িয়ে ৩৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির তালিকা না থাকায় যাত্রী ও টিকিট বিক্রেতাদের তর্ক করতেও দেখা গেছে। যাত্রীদের দাবি, পরিবহনমালিকেরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে নিচ্ছেন। ভাড়া বৃদ্ধির কোনো তালিকা নেই।
তবে কাউন্টার মাস্টার ও টিকিট বিক্রেতাদের দাবি, মালিকেরা ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সমন্বয় করেই কোন রুটে কত ভাড়া হবে, সেটা জানিয়ে দিয়েছেন। আগামীকালের মধ্যেই সেই তালিকা প্রস্তুত হয়ে যাবে।
স্টার লাইন পরিবহনের সহকারী ব্যবস্থাপক নাসির হোসেন বলেন, অনেক যাত্রী এসে ভাড়া কম দিতে চায়, অনেকে অনুরোধও করে। কেউ কেউ ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি মানতেও চায় না। এ নিয়ে তর্কও করতে হয়। সাধারণ মানুষও আর কত সহ্য করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।