ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ভবনের সভাকক্ষে ঢাকা মহানগরের মাল্টিমোডাল গণপরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিথিরা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ভবনের সভাকক্ষে ঢাকা মহানগরের মাল্টিমোডাল গণপরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় অতিথিরা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আজ মঙ্গলবার দুপুরে

ঢাকা মহানগরীতে ৮টি মেট্রোরেল, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে, ২১ পরিবহন হাবের পরিকল্পনা

ঢাকা মহানগরের জন্য একটি সমন্বিত ও ‘মাল্টিমোডাল গণপরিবহন’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান) ২০২৬–২০৪৫ অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে রাজধানীতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে ডিটিসিএ ভবনে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। সভায় বৃহত্তর ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার কৌশলগত দিকনির্দেশনা, চলমান প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয় বলে ডিটিসিএর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

ডিটিসিএ জানায়, নতুন এই পরিকল্পনায় ৮টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, ২টি বিআরটি লাইন, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি পরিবহন হাব নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ২০২৩ সালের ১৯ দশমিক ৮ কিলোমিটার থেকে ২০৩০ সালে ৭২ দশমিক ২ কিলোমিটার, ২০৩৫ সালে ১৩৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার এবং ২০৪৫ সালে ২৬৮ দশমিক ৫ কিলোমিটারে উন্নীত হবে।

আলোচনা সভায় নগরীতে গণপরিবহনের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ডিটিসিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ছিল ২২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে মাত্র ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে মোটরসাইকেল, তিন চাকার যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে। সভায় অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা একটি নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে এই নেতিবাচক প্রবণতা পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।

ডিটিসিএ জানায়, মেট্রোরেলের ফিডার সার্ভিস হিসেবে প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাঁচটি মনোরেল করিডরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্‌-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারদিকে তিনটি রিং রোড নির্মাণের কাজ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পাশাপাশি সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি বৃত্তাকার নৌপথ ও একাধিক ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

আন্তজেলা বাস টার্মিনালগুলো পর্যায়ক্রমে নগরের বাইরে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। এ ছাড়া বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার অগ্রগতি নিয়েও আলোচনা হয়। ডিটিসিএর হিসাব অনুযায়ী, বিআরটিএ অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ৯৮টি। এ অবস্থায় ৩২টি প্রধান রুট এবং ২৫টি ফিডার রুট নিয়ে নতুন বাস নেটওয়ার্কের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সভায় ‘র‌্যাপিড পাস’ কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে ডিটিসিএ জানায়, বর্তমানে ১৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী এই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছেন। শুধু মেট্রোরেলেই প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ লাখ ট্রিপ বা যাত্রা এই স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্টের আওতায় রাজধানীতে ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্টের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া গাবতলী, কমলাপুর ও বিমানবন্দর এলাকায় মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়। এসব হাবে মেট্রোরেল, বাস, রেল, নৌ ও বিমান পরিবহনকে সমন্বিত করে যাত্রীদের জন্য নির্বিঘ্ন যাতায়াতের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান।

উল্লেখ্য, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলের পরিবহন পরিকল্পনা সমন্বয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ডিটিসিএ। ১১টি মন্ত্রণালয় ও ২৭টির বেশি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকির কাজ করে থাকে সংস্থাটি।