নিহত নাসিমা বেগমের মায়ের আহাজারি। জনতা হাউসিং মিরপুর–১
নিহত নাসিমা বেগমের মায়ের আহাজারি।  জনতা হাউসিং মিরপুর–১

রাজধানীর মিরপুর

সংসারে সাশ্রয়ের চেষ্টা, শেষ হলো দেয়ালধসে মৃত্যুতে

রাজধানীর ইউসেপ মিরপুর টেকনিক্যাল স্কুলের পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন নাসিমা বেগম (৪৪)। যা বেতন পেতেন, তা দিয়ে তাঁর ছোট মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগানোসহ সংসার চালাতে কষ্ট হতো। একটু সাশ্রয়ের আশায় টিসিবির পণ্য কিনতে গিয়েছিলেন তিনি। তবে পণ্য নিয়ে বাসায় ফেরা হয়নি তাঁর। দেয়ালধসে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও একজনের।

আজ মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পেছনে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত আটজন। তাঁদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত অপরজনের নাম মো. ফিরোজ (৪৩)। তিনি মিরপুরের শাহ আলীবাগ এলাকায় থাকতেন। তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা হয়েছে। তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

নাসিমা বেগম থাকতেন মিরপুর জনতা হাউজিং এলাকায়। গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জে। তাঁর ছেলে হানিফ মিয়া আজ সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি চাঁদপুরে থাকেন। মায়ের মৃত্যুর খবরে ঢাকায় এসেছেন। দাফনের জন্য মায়ের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাবেন তাঁরা।

বেলা দেড়টার দিকে হঠাৎ কলেজের দেয়াল ধসে পড়ে। এতে দেয়ালের পাশে টিসিবির লাইনে থাকা বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন

মিরপুর থানা–পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কলেজের পেছনের ওই দেয়াল ঘেঁষে প্রতিদিনই টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়। কিছুটা কম দামে নিত্যপণ্য সংগ্রহ করতে নিম্ন আয়ের মানুষেরা সেখানে ভিড় করেন। প্রতিদিনের মতো আজও অনেক মানুষ পণ্য সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। দুপুরের দিকে হঠাৎই দেয়ালটি সারিতে দাঁড়ানো মানুষের ওপর ধসে পড়ে। এতে কয়েকজন দেয়ালচাপা পড়েন। দুজনের মুখ ও পা থেঁতলে যায়। সেখানে থাকা লোকজন ভাঙা দেয়াল সরিয়ে আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে। পরে তাঁদের রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ধসে পড়া মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সীমানা প্রাচীরের অংশ বিশেষ। ২৮ জুলাই

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর বলেন, হঠাৎ একটা বিকট শব্দ হয়ে দেয়ালটি ধসে পড়ে। পাশেই থানার একটি টহল দল ছিল। সবাই মিলে ইটের নিচে চাপা পড়া লোকজনকে উদ্ধার করা হয়। আটজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। নাসিমা বেগম নামের ওই নারীকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। আর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া আরেকজন পুরুষ মারা গেছেন। অন্যদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে।

ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় আহত তিনজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁরা হলেন রাজিয়া বেগম (৫৫), মনোয়ারা বেগম (৩৭) ও মোশাররফ হোসেন (১৯)। তাঁদের মধ্যে রাজিয়া বেগম ডান পায়ে, মনোয়ারা বেগম হাতে ও বুকে এবং মোশাররফ হোসেন পায়ে আঘাত পেয়েছেন।

আহত রাজিয়া বেগমের মেয়ে মাহফুজা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর মা সকালে মিরপুর ৬ নম্বর এলাকার বাজারে যাবে বলে বাসা থেকে বেরিয়েছিল। পথে টিসিবির গাড়ি দেখতে পেয়ে সেখানে গিয়েছিলেন। হঠাৎ দেয়ালে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন।

ঘটনাস্থল নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে রেখেছে পুলিশ। ২৮ জুলাই

‘ভেঙে পড়া দেয়ালে বিম–কলাম ছিল না’

দেয়াল ধসে পড়ার খবর পেয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে তাঁরাও উদ্ধার কাজে অংশ নেন।

দুপুরে ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা উত্তর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. তানহারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, কলেজটির দেয়ালের ভেতরে কোনো বিম বা কলাম ছিল না। শুধু ইট দিয়ে তৈরি দেয়াল ছিল। দেয়ালটা অনেক পুরোনো। বৃষ্টির কারণে ভেঙে পড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তানহারুল ইসলাম বলেন, দেয়ালটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তদন্তের পর বলা যাবে। দেয়াল ভেঙে ফুটপাতের ওপর পড়ায় চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ভাঙা দেয়ালের অংশগুলো ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।