দুর্যোগে উদ্ধারকাজ

সরঞ্জাম আছে, জনবল নেই 

ঢাকা উত্তর সিটি ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে জরুরি পরিচালন কেন্দ্র তৈরি করেছে। জনবল নিয়োগ হয়নি। তার আগেই উদ্বোধন। 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) লোগো
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) লোগো

দুর্যোগকালে উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে জরুরি পরিচালন কেন্দ্র (ইওসি) তৈরি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। যদিও সেই কেন্দ্র পরিচালনার জন্য জনবল এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম গত ৩১ অক্টোবর ইওসিটি উদ্বোধন করেন। জানা গেছে, জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। শিগগির নিয়োগের কোনো সুযোগও নেই। কারণ, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগে।

রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরে ঢাকা উত্তর সিটির কার্যালয়, অর্থাৎ নগর ভবনের দ্বিতীয় তলায় আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ইওসিটি করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য ইওসি খুবই জরুরি। এটা যত দ্রুত সম্ভব, চালু করতে জনবল নিয়োগ দেওয়া দরকার।
মেহেদী আহমেদ আনসারী, অধ্যাপক, বুয়েট

ইওসি মূলত একটি তথ্যভান্ডার বা ডেটাব্যাংক। এতে কোথায়, কার কী উদ্ধারকারী যন্ত্র ও সরঞ্জাম রয়েছে, যন্ত্রের সংখ্যা কত ইত্যাদি তথ্য থাকবে। দুর্যোগে উদ্ধারকারী কারা হবেন, কাকে কাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, তাঁরা কোথায় আছেন, কীভাবে কাজ শুরু করবেন, এসব তথ্যও থাকবে। করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডের একটি জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সিস্টেম বা ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থার একটি মানচিত্র করে তা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হবে। কার্যত কোনো দুর্যোগকালে জরুরি উদ্ধারকাজের পুরো ব্যবস্থাপনা সমন্বয় করা হবে ইওসি (ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার) থেকে।

বাংলাদেশ ভূমিকম্পের দিক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ায় ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ৮০৬ কোটি টাকা ব্যয়ের আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের প্রধান কাজ চারটি—১. রাজধানীতে একটি ইওসি ও ১০টি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ প্রতিষ্ঠা। ২. সিলেটে একটি ইওসি প্রতিষ্ঠা। ৩. ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের জন্য সরঞ্জাম ক্রয়। ৪. সংশ্লিষ্ট সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানো।

২০২২ সালে এসে দেখা যাচ্ছে রাজধানীতে ইওসি চালু হলেও জনবল নিয়োগ হয়নি।

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা কিছুটা পারদর্শী। মূল জনবল নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ সেন্টার সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিগগিরই আলোর মুখ দেখবে। 

যা আছে ইওসিতে

জরুরি পরিচালন কেন্দ্রে ১৯টি ভিন্ন কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ৮৭ ধরনের সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ কেনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম, স্ক্যানার, স্থানান্তরযোগ্য শব্দযন্ত্র, বড় পর্দা (স্ক্রিন), সম্প্রচারযন্ত্র, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের সরঞ্জাম ইত্যাদি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গত জানুয়ারিতে সরঞ্জামগুলো সরবরাহ করে। ইওসির তথ্যভান্ডারটি ৭০ টেরাবাইট ক্ষমতার, ভবিষ্যতে যা আরও বাড়ানো হবে।

সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, ইওসিতে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে। কিছু কিছু যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইওসি আপাতত একটি প্রদর্শনী কেন্দ্রের মতো হয়েছে। সেখানে শুধু যন্ত্রাংশ স্থাপন করা হয়েছে, তথ্যভান্ডার হয়নি। আবার মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণের জন্য তেমন কিছু করা হয়নি।

আতিকুল ইসলাম উদ্বোধনের দিন বলেন, সারা বছরই ইওসি কার্যক্রম চালাবে। সেখান থেকে রাজধানীতে জলাবদ্ধতার জায়গা চিহ্নিত করা, ময়লার গাড়ি ও মশকনিধন কর্মীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, ‘সবার ঢাকা’ অ্যাপ পরিচালনা, খাল, ফুটপাত ও পদচারী–সেতুর চলন্ত সিঁড়ি, অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র, স্মার্ট সড়কবাতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হবে।

উত্তর সিটির কর্মকর্তারা বলছেন, মেয়র যেসব নতুন কাজের কথা বলছেন, সেগুলো করতে করপোরেশন এলাকাকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) আওতায় আনা প্রয়োজন, যা এ প্রকল্পের আওতায় ছিল না। তাই ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কিনতে নতুন একটি দরপত্র আহ্বানের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। 

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ইওসি পরিচালনায় একজন পরিচালক এবং একজন উপপরিচালক পদে কর্মী নিয়োগ প্রয়োজন। নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সমন্বয়, সরঞ্জাম ও পরিচালনা, তথ্য ও প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, জনসংযোগ, অর্থ ইত্যাদি খাতে একজন করে ৭ জন কর্মী লাগবে। সব মিলিয়ে ইওসিতে জনবল থাকবে ৯ জন।

আরবান রিজিলিয়েন্স প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ইওসিতে আপাতত কোনো লোক নেই। প্রাথমিক কাজের জন্য সিটি করপোরেশনের তথ্যপ্রযুক্তি এবং পরিকল্পনা বিভাগের কর্মীদের যুক্ত করা হয়েছে।

‘ইওসি খুবই জরুরি’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী প্রথম আলোকে বলেন, দুর্যোগে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য ইওসি খুবই জরুরি। এটা যত দ্রুত সম্ভব, চালু করতে জনবল নিয়োগ দেওয়া দরকার। তিনি বলেন, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় ইওসি পরিচালিত হয়েছিল বরিশাল থেকে। এটি মূলত একটি ‘কমান্ড সেন্টার’, যার মাধ্যমে উদ্ধার অভিযান সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা হয়।