ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট–বিষয়ক একটি জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কার্যক্রমের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ৭ জুন ২০২৬
ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট–বিষয়ক একটি জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কার্যক্রমের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। ৭ জুন ২০২৬

চিকিৎসার চেয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার চেয়ে মশাবাহিত এই রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এ জন্য দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ডেঙ্গু প্রতিরোধের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আজ রোববার স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, ইউনিসেফ বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের সহযোগিতায় ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিলন হলে ডেঙ্গুর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট–বিষয়ক একটি জাতীয় ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স কার্যক্রমের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু এখন আর সাধারণ কোনো রোগ নয়, এটি পুরো জাতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলা কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা হাসপাতালের দায়িত্ব নয়; বরং দেশের প্রত্যেক নাগরিককে এতে সম্পৃক্ত হতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসকদের ওপর চাপ দিতে পারি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে বলতে পারি। কিন্তু শতভাগ মশা বা লার্ভা ধ্বংস করা সম্ভব কি না, তা নিশ্চিত করতে পারি না। মশা ২০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে, যেকোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকে যেতে পারে। তাই এটি অত্যন্ত কঠিন একটি লড়াই।’

ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নও কঠিন। তিনি বলেন, যদি ব্যাপক ভ্যাকসিনেশনে যেতে হয়, তাহলে বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে। চার মাস পরপর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হলে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে ‘টোটাল ফাইট’ আখ্যা দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটি নালা-নর্দমা, ডোবা, জলাবদ্ধ স্থান এবং কচুরিপানাযুক্ত এলাকা পরিষ্কার না করলে এ যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ।

ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকাদান কর্মসূচির বিষয়টি বিবেচনায় থাকলেও এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং বাস্তবায়নও কঠিন। তিনি বলেন, যদি ব্যাপক ভ্যাকসিনেশনে যেতে হয়, তাহলে বিপুল বাজেটের প্রয়োজন হবে। চার মাস পরপর টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হলে দেশের স্বাস্থ্য বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হবে।

ডেঙ্গুর বিস্তারের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, শহর ও গ্রামে অসংখ্য ছোট স্থানে বৃষ্টির পানি জমে থাকে, যা এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। গ্যারেজে গাড়ি ধোয়ার পর জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত টায়ার, অব্যবহৃত ক্যান, ছোট গর্ত কিংবা বড় ড্রেন ও খালে জমে থাকা ময়লাযুক্ত পানি—সবখানেই লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিরোধব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করা কঠিন। তাই আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর।’

চিকিৎসকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্লাজমা লিকেজ সময়মতো শনাক্ত করা। রোগীর অবস্থা কখন সংকটজনক পর্যায়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক নজর রাখতে হবে।

সোসাইটি অব মেডিসিনের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের সঠিক চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতির বার্তা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

কর্মশালায় অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্রতি মুহূর্তে সতর্ক থাকা জরুরি। নিয়মিত সিবিসি পরীক্ষা এবং প্লাজমা লিকেজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। প্লাজমা লিকেজ বেড়ে গেলে রোগী দ্রুত শকে চলে যেতে পারে, যা জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি করে।

বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় এবার ‘রিঅ্যাকটিভ’ নয়; বরং ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয় এবং মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে তা কমে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্ত এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। এরপর ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন হলেও প্রাণহানি আরও কমে ৪১৩ নথিভুক্ত হয়। এই তথ্য নিশ্চিত করে যে ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশে একটি সারা বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হয়েছে।

প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি কাঠামোবদ্ধ তিন মাসব্যাপী জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ২০২৬ সালে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের প্রাথমিক, টেকসই এবং ক্লিনিক্যালভাবে সুদৃঢ় পদক্ষেপের প্রতিফলন।

ট্রেনিং অব ট্রেইনার্সের পরবর্তী ব্যাচে বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, করপোরেট হাসপাতালসহ বেসরকারি খাতের চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যাতে প্রমাণভিত্তিক মানসম্পন্ন ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে পৌঁছে যায়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের কনভেনর অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের হেলথ ব্যবস্থাপক রিয়াদ মাহমুদ। কার্যক্রমটি সামগ্রিকভাবে সমন্বয় করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ পরিচালক অধ্যাপক মো. হালিমুর রশিদ। এ ছাড়া বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।