সড়ক দুর্ঘটনা
সড়ক দুর্ঘটনা

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

ঢাকায় দুর্ঘটনার হটস্পট পাঁচটি, বেশি হয় রাতে-সকালে

রাজধানী ঢাকায় গত সাড়ে ৬ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৩৮৪ জন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও ২ হাজার ৪৮৮ জন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৮২ শতাংশের কাছাকাছি পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী। অর্থাৎ ৮২ শতাংশের কাছাকাছি নিহত ব্যক্তি পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী।

এ তথ্য দিয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২০ সাল থেকে সদ্য বিদায়ী জুলাই মাস পর্যন্ত রাজধানীতে ১ হাজার ৮৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতের বেশির ভাগই পুরুষ। নারী-শিশুও আছে।

ঢাকায় দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটে রাতে। এরপরে সকালে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মোহাম্মদপুর, কুড়িল বিশ্বরোড ও বিমানবন্দর এলাকা সড়ক দুর্ঘটনার হটস্পট হয়ে উঠেছে বলে উল্লেখ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

ঢাকার সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) ২০২৫ সালে করা এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ঢাকায় বাসের গড় গতি ঘণ্টায় ৯ দশমিক ৭ কিলোমিটার, যা একটি সাইকেল বা রিকশার স্বাভাবিক গতির সমান। পিক আওয়ারে (অফিস শুরু ও শেষের সময়) এই গতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে আসে। আবার যানজটে দীর্ঘক্ষণ এক স্থানে আটকে থাকলে গড় গতি নেমে যায় পাঁচ কিলোমিটারের নিচে। পৃথিবীর উন্নত শহরগুলোর তুলনায় ঢাকায় বাসের গড় গতি এক-তৃতীয়াংশ কম। উন্নত বিশ্বের শহরগুলোয় বাসের গড় গতি ঘণ্টায় ১৪ কিলোমিটার।

সিগন্যাল ছাড়ার পর ঢাকার রাস্তায় যানবাহনগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আবার রাতে ও ভোরে ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া হন চালকেরা। এর বাইরে বাসে পাল্লাপাল্লি করে যাত্রী তুলতে গিয়েও সড়ক দুর্ঘটনা হয়। এ কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানো সম্ভব।
সাইদুর রহমান, রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক

ঢাকার যানবাহনের গতি নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গবেষণা বলছে, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার। তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অন্যদিকে বর্তমানে মানুষের হাঁটার গতি ঘণ্টায় ৪ দশমিক ১৫ কিলোমিটার।

এত নিম্নগতির শহরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বিষয়টি অনেকটাই অস্বাভাবিক বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মূলত চালকের বেপরোয়া মনোভাব এবং পথচারীদের জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকাতেই এত প্রাণহানি বলে তাঁরা মনে করেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, রাজধানী ঢাকার দুর্ঘটনাগুলো রাতে এবং সকালে বেশি ঘটেছে। রাত ১০টা থেকে ভোর পর্যন্ত রাজধানীতে মালবাহী ভারী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। ফলে রাস্তা পারাপারে পথচারীরা বেশি নিহত হচ্ছেন। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় যানজটের কারণে যানবাহনের চালকদের আচরণে অসহিষ্ণুতা ও ধৈর্যহানি ঘটছে, যা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ করছে।

দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ধরন

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে পথচারী ৫৯২ জন (৪২ দশমিক ৭৭ শতাংশ), মোটরসাইকেল আরোহী ৫৩৬ জন (৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ) এবং বাস, রিকশা, সিএনজি ইত্যাদি যানবাহনের চালক ও যাত্রী ২৫৬ জন (১৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ)।

দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সময় পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ভোরে ১৪২ জন (১০ দশমিক ২৬ শতাংশ) সকালে ২৫৮ জন (১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ), দুপুরে ১৯৫ জন (১৪ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ), বিকেলে ১৭৪ জন (১২ দশমিক ৫৭ শতাংশ), সন্ধ্যায় ৯৬ জন (৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ) এবং রাতে ৫১৯ জন (৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ) দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।

রাজধানীতে দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে বাস ২১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-পিকআপ-ট্যাংকার-ময়লাবাহী ট্রাক ৩৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল ২৬ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-জিপ ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং অটোরিকশা-সিএনজি-লেগুনা ১২ দশমিক ৭৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে যুক্ত।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সিগন্যাল ছাড়ার পর ঢাকার রাস্তায় যানবাহনগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আবার রাতে ও ভোরে ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া হন চালকেরা। এর বাইরে বাসে পাল্লাপাল্লি করে যাত্রী তুলতে গিয়েও সড়ক দুর্ঘটনা হয়। এ কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ করে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমানো সম্ভব। এর জন্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজধানীর পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক বাস চালু করতে হবে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বিআরটিসি, ডিটিসিএ, সিটি করপোরেশন এবং ট্রাফিক পুলিশের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি।