চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন পলাশের হাতে ‘মিশুক মুনীর স্মৃতি পুরস্কার’ তুলে দিচ্ছেন আবুল খায়ের। সঙ্গে ছিলেন (বাঁ থেকে) আকা রেজা গালিব, কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা, আসিফ মুনীর ও ত্রপা মজুমদার। ধানমন্ডি, ঢাকা। ৩ অক্টোবর ২০২৬
চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন পলাশের হাতে ‘মিশুক মুনীর স্মৃতি পুরস্কার’ তুলে দিচ্ছেন আবুল খায়ের। সঙ্গে ছিলেন (বাঁ থেকে) আকা রেজা গালিব, কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা, আসিফ মুনীর ও ত্রপা মজুমদার। ধানমন্ডি, ঢাকা। ৩ অক্টোবর ২০২৬

মিশুক মুনীর স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬

মিশুক মুনীরের ছিল স্বতন্ত্র নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি

চিত্রগ্রহণে নান্দনিকতা ও দেশের সম্প্রচার সাংবাদিকতায় স্বতন্ত্র সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির রূপকার মিশুক মুনীরকে স্মরণ করলেন তাঁর স্বজন, সহকর্মী ও বন্ধুরা। আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ বছরের ‘মিশুক মুনীর স্মৃতি পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়। লিলি-মুনীর স্মৃতি রক্ষা ট্রাস্ট ও মিশুক মুনীরের পরিবারের যৌথ উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।

জুরিবোর্ডের মূল্যায়নে এবার শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক হিসেবে পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন বরকত হোসেন পলাশ। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক আবুল খায়ের লিটু। অনুষ্ঠানে বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন মিশুক মুনীরের ভাই আসিফ মুনীর।

পুরস্কার পাওয়ার পর অনুভূতি জানিয়ে চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন পলাশ বলেন, ‘এত সম্মানজনক একটি পুরস্কার পাওয়ার পর নিজেকেই খুব নগণ্য মনে হচ্ছে। মিশুক মুনীরের মতো পথিকৃৎদের পথ অনুসরণ করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবুল খায়ের লিটু মিশুক মুনীরের সঙ্গে পারিবারিক ঘনিষ্ঠতার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, মিশুকের রুচিবোধ, সৃজনশীলতা ও সবকিছু পরিপাটি করে সাজানোর গুণ ছোটবেলা থেকেই তাঁকে মুগ্ধ করত। তিনি বলেন, মিশুককে কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়, তাঁর কাজ নিয়ে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চলচ্চিত্রনির্মাতা আকা রেজা গালিব বলেন, মিশুক মুনীর কেবল একজন ক্যামেরাশিল্পী ছিলেন না; টেলিভিশন সাংবাদিকতায় সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতেও তাঁর বড় অবদান ছিল। বিবিসির কাজের অভিজ্ঞতা টেনে তিনি বলেন, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধারণ করার পাশাপাশি মিশুকের একটি স্বতন্ত্র নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বেসরকারি একুশে টেলিভিশনে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোয় মিশুকের ভূমিকা অনন্য ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিচ্ছেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবুল খায়ের। ধানমন্ডি, ঢাকা। ৩ অক্টোবর ২০২৬

‘মিশুক আমাদের সঙ্গেই থাকে’

সাংবাদিক কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার সময়ের স্মৃতিচারণা করে বলেন, মিশুক ছিলেন প্রাণবন্ত মানুষ এবং তাঁর পর্যবেক্ষণশক্তি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। পেশাগত জীবনে মিশুক তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং স্বাধীনভাবে ও নির্ভয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মিশুক আমাদের সঙ্গেই থাকে, চিরকাল থাকবে।’

অনুষ্ঠানে সাংবাদিক ও লেখক আফসান চৌধুরীর লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, মিশুক মুনীর ও চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের কাজের মধ্যে যে সাহসিকতা ও স্বাধীনচেতা মনোভাব ছিল, তা-ই তাঁদের স্বাতন্ত্র্য গড়ে দিয়েছিল। মিশুকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল দুই ভাইয়ের মতো।

মিশুক মুনীরের ভাই আসিফ মুনীর বলেন, মিশুকের কাজ ও সৃজনশীল চেতনাকে সম্মান জানানোর লক্ষ্যেই এই আয়োজন। তিনি বলেন, ‘মিশুকের প্রতি যে সম্মান ও ভালোবাসা থেকে অনেকে তাঁদের কাজ নিয়ে এই আয়োজনে আবেদন করেছেন, সেই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও ধরে রাখার চেষ্টা থাকবে।’

নাট্যব্যক্তিত্ব ত্রপা মজুমদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মিশুক মুনীরের বড় ভাই আহমেদ মুনীর, লেখক মাহফুজা শিলু ও চলচ্চিত্রনির্মাতা আবির শ্রেষ্ঠ। আয়োজনে বরকত হোসেন পলাশের কাজের অংশবিশেষ এবং মিশুক মুনীরের কর্মময় জীবন নিয়ে নির্মিত একটি সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।

শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী ও বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব লিলি চৌধুরীর দ্বিতীয় সন্তান মিশুক মুনীর ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, আন্তর্জাতিক মানের চিত্রগ্রাহক এবং বাংলাদেশে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সম্প্রচার সাংবাদিকতার রূপকার। চলচ্চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’ থেকে শুরু করে ‘রানওয়ে’ পর্যন্ত বেশির ভাগ চলচ্চিত্রের প্রধান চিত্রগ্রাহক ছিলেন তিনি। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ‘অপরাজেয় বাংলা’র নির্মাণকাজের দৃশ্য ধারণেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। ২০১১ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যুর পর ২০২৩ সাল থেকে এই স্মৃতি পুরস্কার চালু করা হয়। প্রথমবার ২০২৩ সালে সেরা প্রতিবেদক হিসেবে শাকিল হাসান এবং সেরা চলচ্চিত্রকার হিসেবে মাসউদুর রহমান এই পুরস্কার পেয়েছিলেন।